সাল ২০২০। নতুন বছর শুরু হল, আর একদম শুরুতেই যেন ঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নানা বিতর্কিত মন্তব্য আর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ করে চারদিকে কথাবার্তা শুরু হলো, ‘ওরা নাকি ভারতের দালাল’। এ যেন এক অদ্ভুত সময়। কেমন করে যেন হাজার বছরের সামাজিক বন্ধনটাও টলমল করছে।
এই ধরনের গুঞ্জন আর গুজব কেন ছড়ায়, তা নিয়ে আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা আছে। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে যখন যেতাম, তখন দেখতাম বিভিন্ন ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবে হিন্দু-মুসলিম সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আনন্দ করতাম। খাবার-দাবার, গান-বাজনা, সবকিছুতেই সবাই মিলে অংশগ্রহণ করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটল। আজকের দিনে এই ফিসফাস কেন এবং কীভাবে ছড়াল, তা নিয়ে একটু বিশদে আলোচনা করা দরকার।
প্রথমত, রাজনৈতিক কারণ। বাংলাদেশে যখনই কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখনই নানা রকমের গুজব আর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বের হয়। মানুষের বিশ্বাস ও অমূলক ভয়কে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এই কাজগুলো করে থাকে। ‘ভারতের দালাল’ বলে অভিহিত করার মাধ্যমে তারা কেবলমাত্র হিন্দুদেরই নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্ককেও নষ্ট করার চেষ্টা করে। তাদের এই ফিকির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বিভাজন সৃষ্টি করা।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক পারস্পরিক অবিশ্বাস। এই অবিশ্বাস একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে দীর্ঘদিনের ইতিহাস আছে। কিছু মানুষ সবসময়ই থাকে যারা অন্যদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। আস্থা আর বিশ্বাসের মাঝখানে যদি অনমনীয় বাধা তৈরি হয়, তাহলে কেবলমাত্র ক্ষতিই হয়। অথচ, আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যে যুগ যুগ ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল গভীর সংমিশ্রণ। কিন্তু আজ সেই বন্ধন যেন ভাঙতে বসেছে।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের ভূমিকা। সংবাদ মাধ্যমের কিছু অংশ এই ধরনের গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। তারা হয়তো সচেতনভাবে বা কখনো অসচেতনভাবে এমন কিছু খবর প্রচার করে যা মানুষের মনে বিভেদ তৈরি করে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়, এবং সেই আলোচনার ভুল ব্যাখ্যা অনেক সময় জনমনে ভীতি তৈরি করে।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। ফেসবুক, টুইটার, এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে কোনো খবর খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে গুজব রোধে তেমন কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে, অনেকে হয়তো ভুল খবর দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং সেই আতঙ্ক আরও বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? এই প্রশ্নের উত্তর একটুখানি জটিল হলেও, কিছু বিষয় আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি। প্রথমে, আমাদেরকে নিজেদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলের মধ্যে যখন আন্তরিকতার সম্পর্ক থাকবে, তখনই কেউ আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির সাহস পাবে না। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। গুজব এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া রোধে তাদের আরও সচেতন হতে হবে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের মনের খোলামেলা ভাবনা। আমাদের চিন্তাধারায় যদি সংকীর্ণতা থাকে, তবে বিভেদ সৃষ্টি করা খুব সহজ হয়ে যায়। আমাদেরকে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সম্মান করে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শিক্ষা দিতে হবে। আর সেই শিক্ষার শুরুটি হতে হবে পরিবার থেকে। কারণ পরিবারই আমাদের সামাজিক ভিত্তি, যেখানে আমরা প্রথম বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে মিলেমিশে থাকার শিক্ষা পাই।
শেষে, আমি সবসময় বিশ্বাস করি সমাজের উন্নতি তখনই সম্ভব যখন সব ধর্মের, সব জাতির মানুষ একসাথে মিলেমিশে থাকে। ফিসফাস বা গুজব কিছুক্ষণের জন্য হয়তো আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারে, কিন্তু আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত? কারণ, আমরা যদি না থাকি, তাহলে কে থাকবে? আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করেই কি আমরা এই বিভেদের ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে পারি না?
