ওর নামটাই ছিল ‘অপরাধ’: কর্মস্থলে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে টার্গেট হওয়া সংখ্যালঘু যুবকদের গল্প

যদি তোমাকে কেউ প্রশ্ন করে, “তোমার নাম কী?” তুমি নিশ্চয়ই সোজাসাপ্টা জবাব দাও। কিন্তু কখনও কি ভেবেছো, তোমার নামটা হতে পারে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ? আচ্ছা, বলো তো, তোমার নাম দিয়ে যদি তোমার কর্মস্থলে কেউ তোমার বিচার করে বসে, তখন কেমন লাগবে? ভাবনা-চিন্তার স্রোতে ভেসে যাচ্ছি কারণ সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো শুনলাম, তা সত্যিই আমাকে নাড়া দিয়েছে।

বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া হিন্দু মুস্তাফিজুর রহমান, যাকে আমরা সংক্ষেপে মুস্তাফিজ বলে জানি, তার জীবনের গল্প যেন একটি চলচ্চিত্রের মতো। জন্মসূত্রে মুসলমান মুস্তাফিজ, তবে তার কোনো দোষ ছিল না যে তার নাম মুসলিম সংস্কৃতিতে শোনা যায়। মুস্তাফিজের স্বপ্ন ছিল একটি ভালো চাকরি, নিজের এবং পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে সে ছিল মেধাবী ছাত্র। কিন্তু কর্মজীবনে পা রাখতেই ঘটে অন্যরকম ঘটনা।

মুস্তাফিজ যখন একটি বৃহত্তর কর্পোরেটে চাকরি পেল, সে তখন ভেবেছিল জীবনটা হয়তো একটু সহজ হবে। কিন্তু সেদিন কেউ জানত না, তার নামটাই হবে তার সবচেয়ে বড় শত্রু। কর্মস্থলের কয়েকজন সহকর্মী তার নাম নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা শুরু করে, তারা মনে করত “মুস্তাফিজ” নামটা আসলে একজন মুসলিমের হওয়া উচিত। বিষয়টা প্রথমে হালকাভাবে নিলেও, সময়ের সাথে সাথে এই ঠাট্টা ক্রমাগত আঘাত হানতে শুরু করল তার আত্মসম্মানে।

সহকর্মীদের সামান্য মন্তব্যগুলো ক্রমে ক্রমে তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলছিল। অফিসের ছোট ছোট মিটিংয়ে তাকে নিয়ে মন্তব্য করা, তার উপস্থিতিতে এমনভাবে কথা বলা যেন সে একজন বহিরাগত, সেসব খুবই শ্রান্তিকর হয়ে উঠছিল। মুস্তাফিজ অনেকবার এসব নিয়ে ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলেছে, কিন্তু তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি।

মুস্তাফিজের মতো অনেক সংখ্যালঘু যুবকই এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা নাম দিয়ে মানুষকে বিচার করা, তাকে ছোট করে দেখা, এ যেন আমাদের সমাজের এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মুস্তাফিজের মতো অনেকেই যখন তার নিজের পরিচয়ের কারণে আঘাত পায়, তখন মনে হয়, আমরা কি সত্যিই প্রগতিশীল হয়ে উঠেছি?

মুস্তাফিজের গল্প শুনে আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও মনে পড়ে গেলো। আমার এক বন্ধু, নাম তার রাকেশ, সে ছিল একদম আমাদের মতোই একজন স্বাভাবিক যুবক। কিন্তু তার নামও ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা। কর্মস্থলে প্রচুর পরিশ্রম করেও সে তার যোগ্য মর্মে যথাযোগ্য সম্মান পেত না। তার অবস্থান নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে হিংসা ছিল, এবং তার নাম শুনে তারা অনেকেই তাকে আলাদা চোখে দেখত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। কেননা, আমাদের সংবিধান এবং সমাজ উভয়েই ধর্মীয় ও সামাজিক সমতার কথা বলে। তবুও, বাস্তবে আমরা দেখছি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এটা না শুধু তাদের জন্য, বরং আমাদের সমাজের জন্যও অত্যন্ত লজ্জাজনক।

এখন প্রশ্ন হলো, এই বৈষম্য কিভাবে কমানো যায়? প্রথমত, আমাদের সমাজকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো দরকার যে, ধর্মীয় পরিচয় কারও যোগ্যতা বা কর্মক্ষমতার বিচার হতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

এছাড়া, মুস্তাফিজ বা রাকেশের মতো যারা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, তাদের সাহস দেওয়া উচিত। তারা যেন নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করতে পারে এবং নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করতে পারে। আমরা কি সত্যিই এমন একটা সমাজে বাঁচতে চাই যেখানে আমাদের পরিচয় আমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়? নাকি আমরা চাইবো এমন একটা পৃথিবী যেখানে নাম বা ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং মানুষের কাজ ও কৃতিত্ব দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা হবে?

আমি জানি, ব্যাপারগুলো সহজ নয়। কিন্তু যদি আমরা সবাই একটু একটু করে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি, তাহলে হয়তো একদিন আমাদের সমাজে মুস্তাফিজ, রাকেশ বা অন্য কোনো সংখ্যালঘু যুবককে কখনও তার নামে বিচার করা হবে না। আর সেটাই হবে আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন। তোমার কী মনে হয়? আমাদের এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব কিনা? তোমার মতামত জানাও।