আমাদের চারিদিকে যে সমাজটিকে আমরা এতটা আপন করে দেখি, সেটা কিন্তু সব সময়ে সবার জন্য সমান নিরাপদ নয়। আমরা যারা এখানে জন্মেছি, বড় হয়েছি, তারা হয়তো জানিই না কেমন করে কিছু মানুষের জন্য এই সমাজটা প্রতিনিয়ত আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি মানবাধিকার রিপোর্টে এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে যা রীতিমতো চোখ কপালে তুলে দেয়। রিপোর্টের শিরোনামটা পড়তে গিয়ে আমার নিজেরও গলা শুকিয়ে গিয়েছিল জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা বেড়েছে, সংখ্যালঘু নারী-শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই বিষয়টি কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ? আসলে, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার রক্ষা করতে হলে আমাদের এই বিষয়গুলোকে গভীরভাবে বুঝতে হবে। যখন কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণিকে শুধুমাত্র তাদের জন্মগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নির্যাতিত হতে হয়, তখন সেটা খালি সেই গোষ্ঠীর সমস্যা আর থাকে না, সেটা আমাদের সকলের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, অন্যায় যেখানে হয়, সেখানে নীরবতা সেই অন্যায়েরই সমর্থন দেয়।

এই প্রসঙ্গে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে, বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এই ধরনের সহিংসতার ইতিহাসটা কীভাবে গড়ে উঠেছে। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে আমরা নানাভাবে উন্নতি করেছি, কিন্তু কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে জেন্ডার-বৈষম্য এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি অনাচার। সমাজের এই সেগমেন্টগুলোকে আমরা এখনও পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারিনি। আন্তর্জাতিকভাবে, বিভিন্ন দেশে এমন ঘটনা ঘটে, তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট একটু আলাদা। এখানে ধর্মীয় ও সামাজিক পার্থক্যের কারণে বেশ কয়েকটি বিষয় আরও জটিল হয়ে যায়।

সংখ্যাগত তথ্য কী বলছে সেটা জানলে হয়তো বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। গবেষণা অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সমীক্ষায় দেখা গেছে যে জেন্ডার-বৈষম্য এবং যৌন সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। রিপোর্টে উঠে এসেছে যে বিশেষত সংখ্যালঘু নারীরা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি শিশুদের প্রতিও অত্যাচার বাড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এই সমস্যার অন্যতম বড় কারণ।

কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাটি অনেকাংশে গভীর সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কারণের সাথে সম্পর্কিত। সমাজে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ধর্মীয় ভেদাভেদ এর মূল কারণ। আমাদের দেশের অনেক এলাকায় এখনো মেয়েদেরকে শুধুমাত্র গৃহস্থালির কাজেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাওয়া হয়। সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে তথাকথিত স্থানীয় প্রভাবশালীদের অত্যাচার তো রয়েছেই। আর শিশুদের কথা নাই বা বললাম, যারা তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর না থাকা অবস্থায় এ ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী হতে পারে? সরকারের নীতি ও কৌশলগত পদক্ষেপের পাশাপাশি আমাদের নিজেকেও ভাবতে হবে। শিক্ষার প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু সরকারের নয়, আমাদের প্রত্যেকের কাজ। স্কুল-কলেজগুলোতে সচেতনতা প্রোগ্রাম চালু করতে হবে, যেখানে শিশুদের এবং তরুণদের তাদের অধিকার সম্পর্কে জানানো হবে। পাশাপাশি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাজের প্রতি দৃষ্টি রাখা এবং তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করা জরুরি।

আমাদের সমাজে এমন কিছু চ্যালেঞ্জ আছে যা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে আমরা যদি নতুন কিছু শিখতে না পারি, তবে সেটা সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ এবং সমান সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রত্যেককেই এগিয়ে আসতে হবে। এ পরিস্থিতিকে শুধু সহ্য করলেই চলবে না, সেটাকে পাল্টানোর জন্য সচেষ্ট হতে হবে।

শেষে এসে আমার মনে একটু আশার আলো দেখা দিচ্ছে। হয়তো একদিন এই পৃথিবীটা সবাইকে সমানভাবে গ্রহণ করবে। হয়তো সেই দিন আমরা এমন একটা দেশে বাস করবো যেখানে কাউকে তার লিঙ্গ বা গোষ্ঠীর জন্য ভয় পেতে হবে না। তবে সেই দিনটা আসবে কি না, সেটার উপরই আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। প্রশ্নটা এখন আমাদের ওপর আমরা কি এই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?

By arindam