সেদিন বাজারে গিয়েছিলাম মাস্ক, স্যানিটাইজার এই সবমুখে নিয়ে। করোনা তখন আমাদের দেশে সদ্য মাথা তুলেছে, আর আমরা মনে মনে ভীতসন্ত্রস্ত। প্রতিটা দিন যেন একেকটা যুদ্ধের মতো কেটেছে। বাজারে গিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হলাম। দোকানদারদের মধ্যে বেশ কিছু দোকান ফাঁকা, ক্রেতা নেই। আশ্চর্যের বিষয়, এই দোকানগুলো সবই সংখ্যালঘুদের। হঠাৎ পরিচিত এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার, আজ এত ফাঁকা কেন? পাশে দাঁড়ানো একজন ব্যক্তির উত্তর, ওদের দোকান থেকে করোনা ছড়াবে।
কান অবিশ্বাস্য শোনাচ্ছে। একটা মিথ্যা গুজব হতে পারে, কিন্তু এত দূর্দান্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে কে জানত! তবে এই যে বাজারের কোলাহলে হারিয়ে যেতে যেতেও যে দৃশ্য আমি দেখেছি, তা আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষতের কথা বলে। করোনা দূর্যোগের সময় আমরা নিজেদেরকে একসাথে নিয়ে চলার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু ঠিক তখনই এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটল। আমি ভাবছিলাম, এটা কী করে সম্ভব? সংখ্যালঘুদের প্রতি এই কুসংস্কার আর অবিশ্বাস কেন?
যখন কুসংস্কার আর অবিশ্বাস একটা সমাজে বাসা বাঁধে, তখন সেটাকে উপড়ে ফেলা সহজ নয়। এ দেশের ইতিহাসে সংখ্যালঘুদের প্রতি অবজ্ঞা এবং অবমাননা নতুন কিছু নয়। কিন্তু করোনা মহামারীর সময় এমন সংকীর্ণ চিন্তা প্রকাশ পেল, যা আমি নিজের চোখ দ্বারা দেখলাম। মনে হলো যেন আমরা ইতিহাসের কোন অদেখা পাতা উলটে ফেলেছি।
বাজারের ঐ দৃশ্যটি আমাকে চমৎকৃত করে তুলেছিল। আমার মনে হলো, সংখ্যালঘুদের প্রতি এই অবজ্ঞা কিভাবে এত সহজে মানুষের মনে বাসা বাঁধতে পারে? আমাদের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার সাথে এটা কি এতোই জড়িত যে আমরা বুঝতেও পারছি না? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে দেখতে পাবো যে বাংলাদেশের সমাজবিন্যাসে গভীর স্তরে কতটা কুসংস্কার আর ভুল ধারণা লুকিয়ে আছে।
কিন্তু সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে এই কুসংস্কার কিভাবে ছড়ায় তা বোঝা দরকার। এই কুসংস্কার ছড়ানোর পেছনে কিছু বিশেষ কারণ ছিলো। প্রথমত, তথ্যের অভাব। অনেকেই জানেনা করোনাভাইরাস কীভাবে ছড়ায়, কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়। এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ তাদের সংকীর্ণ চিন্তা আর কর্মের মধ্যে মেলে ধরে। দ্বিতীয়ত, গুজব। আমাদের সমাজে গুজব খুব দ্রুত ছড়ায়, আর করোনার মত অজানা ভাইরাস নিয়ে আরও বেশি। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই গুজবগুলো আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ যখন ভয়ে থাকে, তখন তারা বাস্তবতা না জেনে গুজবকে সত্যি বলে মেনে নেয়।
আমাদের সমাজে সহজেই গুজব ছড়ানোর আরেকটি বড় কারণ হলো সাম্প্রদায়িকতা। আমরা এখনও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করতে শিখে গেছি। কিছু মানুষের চোখে সংখ্যালঘু হওয়া মানেই অন্য হয়ে যাওয়া। তারা সহজেই বিশ্বাস করে, এই করোনা সংকটে সংখ্যালঘুরা দায়ী। এটা যেমন ভুল, তেমনই বিপজ্জনক ধারনা। এই সংকীর্ণতা কেবল সংখ্যালঘুদের ক্ষতি করেনা, বরং পুরো সমাজের ভিতর নেমে আসে ভাঙন।
এই সংকটের সময়ে আমাদের উচিত ছিল একে অপরকে সহযোগিতা করা, এক হয়ে এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করা। কিন্তু সেখানে যদি আমরা নিজেদের মধ্যেই দুরত্ব তৈরি করি, তাহলে আমরা কিভাবে এই দুর্যোগ থেকে বেরিয়ে আসব? আমি ভাবছিলাম, এটাই কি আমাদের মানবিকতা? যেখানে একে অপরকে সাহায্য করার বদলে আমরা একে অপরকে দোষারোপ করি?
এই ঘটনার মাধ্যমে আমি বুঝলাম যে আমাদের সমাজে এখনও কোথাও কোথাও গভীর অন্ধকার লুকিয়ে আছে। এই অন্ধকার একদিনেই দূর হবে না। কিন্তু আমরা যদি সচেতন হতে চাই, তাহলে আমাদের এই কুসংস্কার আর বিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। আমরা কিভাবে আমাদের চারপাশের মানুষকে সচেতন করতে পারি, তা নিয়ে ভাবতে হবে।
আমার মতে, আমাদের এই সময়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সহানুভূতি এবং সহমর্মিতা। আমরা যেন গুজবে কান না দিই, কোনো ভ্রান্ত ধারণায় নিজেদের ভুলিয়ে না রাখি। সঠিক তথ্য জানা এবং তা প্রচার করা আমাদের দায়িত্ব। একে অপরকে সাহায্য করতে হবে, যতক্ষণ না আমরা করোনা এবং এই কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসছি।
শেষ পর্যন্ত, এটাই প্রশ্ন থেকে যায়: আমরা কি এই সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হতে পারব? সমাজের সব স্তরে, প্রতিটি মানুষের মনে এই প্রশ্নটি জাগাতে হবে। আমাদের সমাজের এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে, আমরা কি সত্যিই একটি সুষ্ঠু ও সহনশীল সমাজ গড়তে পারব? বিচ্ছিন্নতায় নয়, সংহতিতে আমাদের উল্লম্ফন করতে হবে। আর এই মহামারীর সময়ই হতে পারে সেই পরিবর্তনের সূচনা।
