আমরা যখন কথা বলি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে, তখন অনেকেই মাথা ঘুরিয়ে নেয়। কিছু না দেখার ভান করে, কিংবা শুধু চোখের দৃষ্টিকে ঘোলাটে করে রাখে যাতে বাস্তবতা ফাঁকি দেয়। কিন্তু বাস্তবতার সাথে চোখ মেলে রাখা জরুরি। আজ আমি আপনাদের বলবো এমন একটি বিষয়ে, যা হয়তো অনেকেই জানে, কিন্তু কেউ বলে না। শিরোনাম দেখে তো বুঝতেই পারছেন, আজ আমরা কথা বলব রেশনের লাইনে সংখ্যালঘুদের পিছিয়ে পড়া নিয়ে।

একটি ছোট্ট গল্প বলি। একদিন রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সামনের মানুষদের কথোপকথন শুনছিলাম। একজন বলছিলেন, ‘ওদের আগে দিলে আল্লাহ রাগ করবেন।’ সত্যি বলতে কি, এমন কথা শুনে বুকের ভেতর কেমন জানি একটা ব্যথা অনুভব করলাম। মন বলে উঠলো, কেন এই ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কিছু বলে না? কোথায় হারিয়ে গেছে মানবতার সেই চিরাচরিত বোধ?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, রেশনের লাইনগুলোতে সংখ্যালঘুরা পিছিয়ে পড়া একটি সাধারণ ঘটনা। আর এই ব্যাপারটা যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। মানবতা, সমানাধিকার, আর সহমর্মিতা নিয়ে যারা কথা বলেন, তারা কি এই বিষয়টি নিয়ে কখনো ভাবেন? আপনি আমিও তো জানি, এই কথা বলার সাহস অনেকেরই নেই। কারণ আমাদের সমাজে এরকম ঘটনা নিয়ে কথা বললে ‘গুরু’ মানে ক্ষমতাশালীরা রেগে যেতে পারে। আর এই রেগে যাওয়ার ভয়ে আমরা চুপ করে থাকি। কিন্তু কেন?

আজকের দিনেও, আমরা যারা আধুনিকতার পক্ষে কথা বলি, তাদের উচিত এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে সরব হওয়া। কোনও ধর্ম, কোনও রঙ, কোনও বর্ণের দোহাই দিয়ে যদি আমরা কাউকে পিছিয়ে রাখি, তবে তা আমাদের মানবতার প্রতি অবজ্ঞা। আমরা যদি এই বিষয়টি নিয়ে কথা না বলি, তবে অন্য কেউ এগিয়ে এসে বলবে কি?

জানি, আপনারা অনেকে আমাকে বলবেন, ‘ভাই, এটা তো আমাদের সংস্কার। আমরা এর বিপরীতে কিছু বলবো না।’ কিন্তু আমি বলি, আমাদের সংস্কার তো পরিবর্তনশীল। যুগের সঙ্গে আমরা যদি আমাদের চিন্তা-ভাবনা পরিবর্তন না করি, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা কি রেখে যাবো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য?

প্রতিটি মানুষের জীবনের ভিত্তি গঠন করে তাদের এই রেশনের লাইন। যদি এই লাইনেই তারা বৈষম্যের শিকার হয়, তাহলে তারা কিভাবে নিজেদের মনোবল নিয়ে উঠে দাঁড়াবে? আমাদের শিশুদের শিক্ষিত করতে হবে এই চিন্তা দিয়ে যে, আমাদের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। সবাই সমান।

আমাদের দেশে সংখ্যালঘু মানে শুধু জাতিগত সংখ্যালঘু নয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরকেও বোঝায়। যে লাইনগুলোতে মানুষ দাঁড়ায় তাদের দৈনন্দিন জীবন প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য, সেখানেই যদি বৈষম্য থাকে, তাহলে মানুষ কীভাবে ভালোভাবে বাঁচবে? আর এই বৈষম্যের মূল কারণ কি, তা নিয়ে আমরা কতটুকু সচেতন?

আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলছি, তখন আমাদের উচিত সেটা নিয়ে আরো বেশি করে ভাবা। আমাদের উচিত এমন কিছু করা যাতে করে সমাজে এই বৈষম্যের কাঁটা দূর হয়। যারা রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, তারা কি সত্যি আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারেন? আল্লাহ তো সকলকে সমানভাবে সৃষ্টি করেছেন, তাহলে তাঁর অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে কি করে কেউ দাঁড়ায়?

এই ধরনের কুসংস্কার থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সংখ্যালঘুরা যেন আর পিছিয়ে না পড়ে, এটাই আমাদের কাম্য। সমাজের সব স্তরে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা যদি এখনও চুপ করে থাকি, তাহলে আমাদের আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

আজকের এই লেখাটির শেষ পর্যায়ে এসে আমি আপনাদের একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই: আমরা কি সত্যি মানবতার পাশে আছি, নাকি শুধুই নিজের স্বার্থ দেখছি? আমাদের উচিত এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, কারণ উত্তর খোঁজা মানেই নতুন কিছু শিখতে শুরু করা। আর আমরা যদি শিখতে শুরু করি, তবেই আমাদের সমাজে সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে।

আশা করি, এই লেখাটি পড়ে আপনি আপনার চারপাশের বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে পারবেন। চলুন আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি যেন আমাদের সমাজে সংখ্যালঘুরা আর পিছিয়ে না পড়ে। আমরা সবাই একসঙ্গে থাকলে তবেই কিন্তু আল্লাহ খুশি হবেন, তাই না?