আদিবাসী খ্রিস্টানদের জমি ‘সরকারি প্রকল্পে’ চলে যাওয়ার গল্প শোনে কী আপনার চোখের কোণায় একটু জল এসেছে? আমি যখন প্রথম এই গল্প শুনেছিলাম, আমার হৃদয়ের এক কোণে যেন একটা খোঁচা লেগেছিল। এই ঘটনার পেছনের সত্যটা জানলে আপনিও আমার মতো অবাক হতে পারেন। আমরা এতদিনে যতই উন্নত হই না কেন, কিছু কাহিনী হৃদয়কে আলোড়িত করবেই।

বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়, বিশেষত খ্রিস্টান আদিবাসীরা, যুগ যুগ ধরে তাদের নিজস্ব জমি, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের অনেকেই সম্মুখীন হয়েছেন এক নিঃসঙ্গ যুদ্ধে, যেখানে প্রতিপক্ষ হলো সেই রাষ্ট্রযন্ত্রই, যে তাদের নিরাপত্তা এবং স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ছিল। সরকারি প্রকল্পের আওতায় তাদের জমি কেমন করে চলে যাচ্ছে, তা জানার পর সত্যিই বিস্ময়কর লাগে।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের দেশে উন্নয়নের জন্য নানা প্রকল্প নেওয়া হয়। তৈরি হয় সড়ক, বানানো হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা স্বাস্থ্য কেন্দ্র। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যদি আমরা লক্ষ্য না রাখি কার জমি দখল হচ্ছে, কার জীবন বিপন্ন হচ্ছে, তাহলে ওই উন্নয়ন আমাদের কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। আদিবাসী খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। তাদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করেন কৃষি, মৎস্য পালন কিংবা ছোট ছোট ব্যবসার মাধ্যমে। জমি হারিয়ে তারা অনেকটা পথ হারিয়ে ফেলেছেন।

আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বহুদিন ধরে তাদের জমি রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় দরখাস্ত জমা দিয়েছেন, আন্দোলন করেছেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন। কিন্তু একদিকে রয়েছে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প, যা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর অনেকটাই চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে আদিবাসীদের আবেদন শুনতে প্রশাসনের সময় এবং ইচ্ছা দুটোই কমে আসে।

তবে এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে আগে আমাদের চোখ খুলতে হবে। আমরা যদি মনে করি যে, শুধুমাত্র উন্নয়ন প্রকল্পের নামেই আমরা সবকিছু করতে পারব, তাহলে সেটা শুধু একটি ভুল নয়, একধরনের অন্যায়ও বটে। ভাবতে হবে, কিভাবে আদিবাসীদের সঙ্গে কাজ করে তাদের জমি ও সংস্কৃতি রক্ষা করা যায়। তাদের জীবনধারা যাতে বজায় থাকে, সেদিকে খেয়াল রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ পরিবর্তন কিভাবে আসবে? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের সরকারে এবং সমাজে প্রকৃত অর্থে যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের মনোভাবের পরিবর্তন হওয়া দরকার। তাদের উচিত আদিবাসীদের সঙ্গে আরও সংলাপ এবং সহযোগিতার পথ খুঁজে বের করা। আমরা যদি উন্নয়ন চাই, তবে সেটা অবশ্যই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে করতে হবে, কারও ওপর জোর করে নয়।

এটা কি সম্ভব? হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব। যদি আমাদের প্রবীণ নেতারা এবং সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এ বিষয়ে সচেতন হন এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেন, তবে আদিবাসীরা তাদের প্রকৃত অধিকার ফিরে পাবেন। তাদের জমি রক্ষা পাবে, তাদের সংস্কৃতি রক্ষা পাবে এবং তারা নিজেদের মতো করে জীবনযাপন করতে পারবে।

আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের আদিবাসীরা শুধু একখণ্ড জমির জন্য সংগ্রাম করছে না। তারা সংগ্রাম করছে তাদের জীবন, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য রক্ষার জন্য। এই সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আশা করি, আমরা সবাই এই গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারব এবং তাদের সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিতে পারব।

যদি আমরা আদিবাসীদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি, তাহলে একদিন হয়তো আমাদেরও এমন একটি গল্পের প্রধান চরিত্র হয়ে যেতে হতে পারে। তাই আপনাদের কাছে আমার এই প্রশ্ন: আদিবাসীদের পাশে দাঁড়াতে আমরা কি প্রস্তুত?

By sukanta