এক কাপ চা হাতে বসে, আমাদের চারপাশের ঘটনাগুলো নিয়ে একটু ভাবুন। খবরের কাগজ কিংবা টিভির পর্দায় দেখা গেল যে কোনো একটি সংকট, যা সত্যিকার অর্থে আমাদের জীবনে বাস্তব প্রভাব রেখে যাচ্ছে। প্রায় সময়ই, আমরা এই খবরগুলো উপেক্ষা করি। কারণ আমাদের মনে হয়, ওই ঘটনাগুলো হয়তো আরেকজনের দুঃখ, আরেকজনের বিপদ। কিন্তু যখন সেই সংকট আমাদের ঘরের দরজা পর্যন্ত এসে উপস্থিত হয়, তখন বুঝতে পারি এই খবরগুলো মিডিয়ায় মাত্র কয়েক লাইন জায়গা পেলেও, মাঠে এর প্রভাব কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী।
বছরটা ছিল ২০২০, যখন সারা বিশ্বের মানুষ করোনাভাইরাসের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। প্রতিদিনের খবরগুলোতে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা আর আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলছিল। তবে এরই মাঝে কিছু সংকট আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রায় প্রভাব ফেলছিল। কিছু খবর ছিল, যেগুলো মিডিয়ায় খুব সামান্যই আলোচনার সুযোগ পেয়েছিল যেমন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরাঞ্চলের বন্যা। এসব খবর খুব অল্প শব্দে প্রকাশিত হলেও, বাস্তব জীবনে এর প্রভাব কিন্তু ছিল দীর্ঘস্থায়ী আর সুদূরপ্রসারী।
কিছুদিন আগে, গাজীপুরের এক চা দোকানে বসে গ্রামের এক কৃষকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, “সারাদিন মাঠে কাজ করে এসে যখন টিভি খুলি, তখন দেখি আমাদের এলাকার প্রচণ্ড বন্যা নিয়ে শুধু এক মিনিটের রিপোর্ট। অথচ এই বন্যাতেই তো আমাদের বছরের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।” এই কথাটা কানে আনা মাত্রই মনে হলো, এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কত সহজেই অগ্রাহ্য করতে পারি। মিডিয়াতে কয়েক লাইনের খবর মনেই হয়, যেন ভিন্ন কোনো পৃথিবীর সংকট। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এই সংকট আমাদের নিজেদের দুশ্চিন্তা আর কষ্টগুলোর প্রতিফলন।
বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, সেখানে মিডিয়ার দায়িত্ব আরও বেশি। আমাদের মিডিয়া রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বারবার আলোচনা করেছে, কিন্তু তাদের জীবনের প্রতিদিনের যে সংকট, সেটা কি সত্যিকার অর্থে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে? নাকি আমাদের মনোযোগ কেবলমাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল? রোহিঙ্গারা শুধু আমাদের দেশে আশ্রয় নেয়নি, তারা আমাদের অর্থনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতিতে একটি স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের জীবিকা, শিক্ষার অধিকার এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর এই শরণার্থী সংকট কী ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে, সেটা কিন্তু মিডিয়ায় তেমন করে আসেনি।
ঠিক একইভাবে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরাঞ্চলের বন্যাও আমাদের দেশের অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রতি বছর যখন জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে আমাদের নদীগুলো উন্মত্ত হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এই বন্যা প্রভাবিত করে ফসলের ক্ষতি, মানুষের জীবনযাত্রার অবনতি এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের চক্রে ফেলে দেয়। মিডিয়াতে হয়তো এই খবরগুলো কয়েক দিনের বেশি টিকে থাকে না, কিন্তু মাঠে যারা এর সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করছে, তাদের জন্য এই অভিজ্ঞতা দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের রূপ নেয়।
একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের মিডিয়া কি আদৌ এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে? মিডিয়ার কাজ তো শুধু তথ্য সরবরাহ করা নয়, বরং সত্যিকারের প্রভাব তুলে ধরা, যাতে করে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, মানুষ উদ্বুদ্ধ হয় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। এই কথাগুলো বলতে বলতে মনে হয়, মিডিয়ার কাছে আমাদের প্রত্যাশা কি কিছুটা বেড়ে যাচ্ছে? নাকি মিডিয়ার কাছ থেকে আমরা যা পাওয়া উচিত তা এখনও পাইনি?
অবশ্যই, মিডিয়ার সীমাবদ্ধতা আর চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু তারপরও, আমাদের প্রত্যাশা যে অনেকটাই পূরণ হচ্ছে না, সেটা অস্বীকার করা যায় না। মিডিয়া আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ, এবং তার দায়িত্ব হলো খবর আর তথ্য মানুষের কাছে যতটা সম্ভব সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া। আর আমাদের, সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব আছে। শুধু খবর পড়ে বসে থাকলেই হবে না। সামাজিক সংবেদনশীলতা বাড়াতে হবে, অন্যদের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করতে হবে।
আজকের দিনে, যখন আমরা মিডিয়ার কোনো খবর দেখি বা পড়ি, তখন আমাদের উচিত একটু গভীরে যাওয়া। শুধুমাত্র শিরোনামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে খবরের গভীরে যাওয়া। কারণ মিডিয়ায় কয়েক লাইনের খবর হয়তো আমাদের মনোযোগকে কিছুক্ষণের জন্য ধরে রাখতে পারে, কিন্তু মাঠে সেই খবরের প্রভাব হয়তো অনেক দীর্ঘস্থায়ী।
তাহলে আমরা কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারি? আমাদের নিজেদের থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা যদি শুধু মিডিয়ার ওপর নির্ভর না করি, বরং নিজেরা সচেতন হই, তাহলে হয়তো মাঠের সেই আতঙ্ক কিছুটা সহজ হয়ে উঠবে। মিডিয়া যতই সীমাবদ্ধ হোক না কেন, আমাদের দায়িত্ব নিজেদের সচেতনতা বাড়ানো এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।
অবশেষে, প্রশ্ন থেকে যায় আমরা কি সত্যিই মিডিয়াকে দায়িত্বপূর্ণ ভাবে কাজ করতে দিতে পারছি? নাকি আমাদের নিজেদের সচেতনতা বাড়িয়ে জ্ঞানার্জন করা উচিত, যাতে করে আমরা নিজেদের এবং আমাদের চারপাশের মানুষের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই, কিন্তু খুঁজে বের করাটা এখনই সময়ের দাবি।
