প্রতিবছর শরতের আকাশ যখন নীলের গহীনে লুকিয়ে থাকে, বাতাসে কাশফুলের মৃদু মৃদু দোল তখন বুঝে যাই দূর্গোৎসবের ঢাক ডোল বাজছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের এই প্রধান উৎসব আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বর্তমানে পূজা মানেই যেন এক অনন্য ঝুঁকি ম্যানেজমেন্টের খেলা। বিশেষ করে আয়োজকদের জন্য এই সময়টা যেন আতঙ্কে কাটে। তাদের রাত জেগে পাহারা দেওয়ার সময় যেন কোনো কিছুতেই আশ্রয় নেই। কারণ আমাদের সমাজে হঠাৎ ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনা, যা পূজার আনন্দকে মাটি করে দিতে পারে।

বিগত কিছু বছর ধরে ঢাকায় এবং অন্যান্য বড় শহরগুলোতে পূজা উদযাপন নিয়ে আমরা বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। যেমন গত বছর ঢাকার একটি পূজামণ্ডপে রাতের অন্ধকারে কেউ বিষধর সাপ ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এক নাশকতা। শুধু তাই নয়, সিসিটিভির ক্যামেরা ফুটেজ থেকে দেখা যায় একদল যুবক রাত্রিতে মণ্ডপের চারপাশে ঘোরাঘুরি করে, মাঝে মাঝে মণ্ডপের দিকে পাথর ছুড়ে মারে। এমন ঘটনাগুলো দেখে আয়োজকরা যেন আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। এতো রাত জাগার পরও যখন কোনো পূজারি এসে জানায় যে তার মণ্ডপে এমন কিছু ঘটেছে, তখন আয়োজকদের কি অবস্থা হয় ভাবতে পারো?

উৎসবের আনন্দ যখন সন্ত্রাসের ছায়ায় ঢেকে যায়, তখন মারাত্মক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা বাংলাদেশিরা সব সময়ই মিলেমিশে থাকতে পছন্দ করি। কিন্তু এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদের ঐক্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। ধর্মীয় সহিংসতা সব সময়ই একটি জঘন্য অপরাধ এবং এ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে বের করতে হবে আমাদেরই। খুঁজে বের করতে হবে সেই মোড়লদের যারা এই দুষ্কৃতিদের আশ্রয় দেয়।

একজন আয়োজকের দায়িত্ব শুধু পূজা মণ্ডপের সাজসজ্জা বা প্রতিমা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখন সময় এসেছে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও। যেমন, আয়োজকরা এখন মণ্ডপের চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন। মণ্ডপের প্রবেশ পথে রাখা হয় হাত মেটাল ডিটেক্টর। নিরাপত্তার স্বার্থে ভলান্টিয়ারদের দল তৈরি করা হয়। অনেক জায়গায় পুলিশ প্রশাসনও সহযোগিতা করে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সব জায়গায় প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি না থাকায় আয়োজকদের নিজেরাই সবকিছু সামলাতে হয়।

পূজা মানেই তো আনন্দ, উৎসব, মিলনমেলা। কিন্তু এই আনন্দের মাঝে যদি ভয় ঢুকে যায়, তাহলে সেই উৎসবের মানে আর কী থাকে? আমি নিজেও যখন ছোট ছিলাম, রাতের বেলাতে প্যান্ডেলে বসে ঠাকুর দেখতে পছন্দ করতাম। কিন্তু এখনকার আয়োজকদের সেই সুযোগ কোথায়? তাদের মন হয়তো সারাক্ষণ এই চিন্তায় থাকে যে, না জানি কখন কি ঘটে যায়। এভাবেই তো পূজার রাতগুলো বয়ে যায়!

কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে কি পূজার আনন্দ ধরে রাখা যাবে? আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত সম্প্রীতির এই উৎসবকে সুরক্ষিত রাখা। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার এই কথা যেন শুধু মুখের বুলি না হয়। আমাদের মনেও যেন এর দৃঢ় স্থান থাকে। ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, যে সমাজে আমরা একসাথে মিলে মিশে থাকতে চাই, সেখানে এই অবিশ্বাসের মেঘ কখন উড়ে এল? এই বিষাক্ত ধোঁয়া কি আমাদের মনকে কালিমালিপ্ত করবে না? পূজা হয়তো একদিনের আনন্দ, কিন্তু এই আনন্দের মাঝে যদি ভয়ের ছায়া থাকে, তাহলে এই আনন্দের মানে কী থাকবে?

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমাদের সমাজের শিক্ষিত, সচেতন সকল মানুষের উচিত এগিয়ে আসা। আমাদের উচিত এই অপ্রীতিকর ঘটনা গুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং যারা এই ধরনের ঘৃণ্য কাজের সাথে জড়িত তাদের প্রতিহত করা। যদি আমরা সকলে মিলে এই অসুস্থ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি তাহলে হয়তো একদিন পূজা মানে শুধুই আরাধনা, আনন্দ আর মিলনের উৎসবে পরিণত হবে।

তবে একটা কথা নিশ্চিত করা দরকার, আমাদের সামাজিক পরিবেশে শুধুমাত্র ধর্ম নিয়ে ঝগড়াঝাটি বা বিতর্কের জন্য কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। আমরা যদি এই জায়গা থেকে নিজেরা সরতে পারি, নিজের দৃষ্টিভঙ্গী একটু খোলামেলা করতে পারি, তাহলে সে দিন আমাদের পূজা হবে শুধুই উৎসব, শুধুই আনন্দের এবং সম্পূর্ণ মুক্তিভাষী এক মিলনতীর্থ। শুনতে কেমন শিহরণ জাগায় না? তুমি কি মনে করো আমরা সেই দিনের স্বপ্ন দেখতে পারি না? তোমার মতামত কী?

By sukanta