থানায় গিয়ে ‘মীমাংসা’র প্রস্তাব: হামলাকারী শক্তিশালী হলে আইনের দাঁত নরম হয়ে যায়
শিরোনামটা কেমন লাগল? একটু চমকে দিলো না? এই শিরোনামটা কিন্তু হাওয়ায় ভাসানো নয়। এটা আমাদের বাস্তব জীবনের একটা কঠিন চিত্র। আমরা সবাই জানি যে, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কিন্তু যখন হামলাকারী শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন যেন সেই আইনের দাঁতই নরম হয়ে যায়। আর থানায় গিয়ে ‘মীমাংসা’র প্রস্তাবটা যেন আরও বেশি জ্বালিয়ে দেয় এই অসম ব্যবস্থাকে।
বাংলাদেশে আইনকে কার্যকর করতে গেলে একটা বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আইন সবার জন্য সমান, এই কথাটা আমরা বইয়ে পড়ি, বক্তৃতায় শুনি, কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তা দেখতে পাই? যখন কারো কোনো ধরনের হামলার শিকার হন, তার প্রথম ঠিকানা হচ্ছে থানা। কিন্তু থানায় পৌঁছানোর পরেই শুরু হয় নানা ধরনের অসুবিধা। পুলিশ অনেক সময় ঘটনা মীমাংসার প্রস্তাব দেয়, যাতে মামলা দায়ের না করতে হয়। কিন্তু কেন? কারণ থানার ভেতরেও নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপ এবং প্রভাব কাজ করে। আরো গভীর বিষয় হচ্ছে, এই মীমাংসার মাধ্যমে অনেক সময় হামলাকারী রক্ষা পেয়ে যায়, আর ভুক্তভোগীর কষ্টের কোনো সমাধান হয় না।
কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুর অভিজ্ঞতা ছিল এ রকম। সে একজন রিকশা চালকের বিরুদ্ধে মামলা করতে থানায় গিয়েছিল, কারণ সে তার ওপর হামলা চালিয়েছিল। থানায় গিয়ে সে যেই অভিজ্ঞতা হল, তা হয়তো অনেকেরই জানা। পুলিশের একজন অফিসার তার সাথে খুব সৌজন্যমূলকভাবে কথা বলল এবং বলল, “আপনি মামলা করে কি করবেন? আপনার তো সময় নষ্ট হবে। তার থেকে মীমাংসা করুন।” এই কথার পর সে ভাবল, এই কি তবে আমাদের আইনের ক্ষমতা? শক্তিশালী ব্যক্তিরা যেভাবে তাদের প্রভাব খাটিয়ে নিজের পক্ষে আইনের ব্যবস্থা করতে পারে তা ভাবতেই দুঃখ হয়।
আমাদের দেশের আইন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনেক খবর আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। বিশেষ করে হামলাকারীরা যদি অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী হন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইন যেন নীরব হয়ে যায়। এমনকি কখনও কখনও থানার কর্মকর্তারাও এই প্রভাবশালীদের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য হন। আর ভুক্তভোগী তখন কি করবেন? তারা হয়তো ভাবেন, মীমাংসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কিন্তু এই প্রস্তাবগুলো কেন আসে? এর পেছনে আছে বেশ কিছু কারণ। প্রথমত, আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যও নিজেদের কাজকে এড়িয়ে যেতে চান। মামলা দায়ের এবং প্রমাণ সংগ্রহ করতে হলে অনেক সময় এবং শ্রম প্রয়োজন হয়। তার পরিবর্তে মীমাংসা করলে তাদের কাজ সহজ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, থানার উপরও রাজনৈতিক চাপ থাকে। ক্ষমতাধর বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি কোনোভাবে থানার উপর চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে আইনও তার পথে বাধা পেতে পারে। আর তৃতীয়ত, অনেক সময় সাধারণ মানুষও আইন নিয়ে ঝামেলায় পড়তে চান না। মামলা করলে কোর্টে যেতে হবে, বিচার পেতে অনেক সময় লাগতে পারে এইসব চিন্তা ভুক্তভোগীদের মনে থাকে, আর সেই সুযোগে কিছু অসাধু কর্মকর্তারা মীমাংসার প্রস্তাব দেন।
কিন্তু এই সমস্যার সমাধান কি? আমাদের উচিত সচেতনতা বাড়ানো এবং আমাদের আইনযন্ত্রাসমূহের সঠিক ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দেওয়া। যদি আমরা সকলে মিলে এই সমস্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, তবে হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা হলেও পরিবর্তন হতে পারে। আমাদের উচিত প্রতিটি আইনভঙ্গকারীকে তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিতে সমানভাবে নিশ্চিত করা এবং থানার অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
একটা ভালো উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। একবার একজন সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে সাহস করে তার মামলা দায়ের করেছিল, আর সেই মামলাটি কোর্টে গিয়েছিল। আদালত তার পক্ষে রায় দেয় এবং অপরাধী শাস্তি পায়। এই ঘটনা কিন্তু সবার জন্য একটা উদ্বুদ্ধকর উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের থানাগুলোকে সেই রকম উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে।
শেষ কথা, সমাজে যে কোনো অনিয়ম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনের দাঁড়ানো উচিত দৃঢ়ভাবে। হামলাকারী যতই শক্তিশালী হোন না কেন, আইনের দাঁত কখনোই নরম হওয়া উচিত নয়। আর আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং সঠিক আইন প্রয়োগের জন্য সংগ্রাম করা। তাই প্রশ্ন রেখে যাই আপনি কি আইনের সঠিক প্রয়োগে আপনার ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত?
