প্রথমে একটা কথা বলি, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের একটা স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সেটা ছিল এমন একটা দেশ, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে। কিন্তু আজকে যখন আমরা এই সময়ের দিকে তাকাই, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার দিকে, তখন আমাদের বিবেক প্রশ্ন করে আমরা কি সেই স্বপ্নের পথে এগোচ্ছি, না কি হারিয়ে যাচ্ছি?

২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৩৬৭৯টি হামলার কথা শুনলে মনে হয়, যেন আমরা কোনো ভীতিকর সিনেমার গল্প শুনছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়, এটা আমাদের সমাজেরই একটা অংশ। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই সহিংসতার মাত্রা এতটা বৃদ্ধি পেল? একদিকে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, অথচ অন্যদিকে এই ধরনের নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে।

২০২০ সালটা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোভিড-১৯ এর কারণে পুরো বিশ্বই যখন স্থবির, তখন আমাদের দেশে একটা নতুন আবির্ভাব ঘটে সহিংসতার। ধর্মীয় সংকীর্ণতা আর রাজনৈতিক স্বার্থের মিশেলে যখন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, তখন সমাজের ভিত্তি নড়ে ওঠে। এই বছরটিতে যেমন অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, তেমনই কিছু মানুষ আবার সমাজের ভেতরে হানাহানি সৃষ্টি করতেও পিছপা হয়নি।

এটা সত্যি যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে যে সহিংসতা হয়েছে, সেটা একটা বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। প্রতিটি মানুষ তার ধর্ম, সংস্কৃতি অনুযায়ী মুক্তভাবে বসবাস করবে, সেটাই তো প্রত্যাশিত। অথচ কিছু সংখ্যক মানুষ এই নিয়মে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। আপনি যদি ভেবে দেখেন, তাহলে বুঝবেন যে, এই ধরনের ঘটনা শুধুমাত্র একজন মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না, বরং পুরো সমাজের ওপর এক ধরনের কালো ছাপ ফেলে।

আমার মনে আছে, ছোটবেলায় আমার এক হিন্দু বন্ধু ছিল, নাম ছিল রাজীব। আমরা একসঙ্গে খেলতাম, ঘুরতাম। কিন্তু হঠাৎ একদিন সে আর স্কুলে আসলো না। পরে শুনলাম, তার পরিবার তাদের গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। কারণ, তার পরিবারকে তাদের ধর্মের কারণে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। সেই দিন আমার মনে যে আঘাত লেগেছে, আজও সেটা ভুলতে পারিনি।

এই সহিংসতাগুলো যেমন ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলে, তেমনই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও ব্যাহত করে। একদিকে যদি আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, অন্যদিকে এই ধরনের বাধাগুলো সেই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

এখন যদি কথা বলি, তাহলে কী করে এই ধরনের সহিংসতা রোধ করা যায়? প্রথমত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবাধিকার বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ছোট থেকেই যদি শিশুরা শিখে যে, সকল ধর্মের মানুষ সমান, তাহলে হয়তো ভবিষ্যত প্রজন্ম এই ধরনের ঘটনাগুলোকে প্রতিরোধ করতে পারবে।

এছাড়া, সরকারেরও উচিত কঠোরভাবে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। যারা এই ধরনের সহিংসতায় জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে সমাজকে বার্তা দেওয়া উচিত যে, এই ধরনের কার্যকলাপ কোনোমতেই বরদাস্ত করা হবে না।

তাছাড়া, আমাদের সকলেরই উচিত একে অপরকে সহানুভূতির সাথে বোঝা। আমাদের সমাজে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, সেটা কমিয়ে আনার জন্য আমাদের প্রত্যেককেই সচেষ্ট হতে হবে। একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহনশীলতা প্রদর্শন করলে হয়তো এই সহিংসতা অনেকটাই কমে আসবে।

শেষ কথা হলো, আমরা যদি প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক উন্নয়নের দিকেও নজর দেই, তাহলে হয়তো আমাদের দেশ সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হতে পারবে। প্রশ্নটা হলো, আমরা কি সেই দিকে এগোতে পারব? নাকি আমরা শুধু উন্নয়নের মোহে অন্ধ হয়ে সবকিছু ভুলে যাব? সিদ্ধান্তটা আমাদের হাতেই। আমাদের প্রত্যেককেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। একতাই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলেই আমরা এক বাংলাদেশ। আসুন, সবাই মিলে এমন একটা সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখি যেখানে কোনো ধর্মীয় বিভাজন বা সহিংসতা থাকবে না। আশা করি, এই লেখাটা আপনাকে একটু ভাবাবে এবং আমাদের সকলেরই দায়িত্ব বুঝতে সাহায্য করবে।

By sukanta