বছরটা ছিল ২০২১, ফেব্রুয়ারির এক শীতল সকাল। চারদিকে জোরালো গুঞ্জন উঠেছিল ফেসবুকের একটি পোস্ট নিয়ে। তখন আমরা যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়, তারা অনুভব করছিলাম, পরিস্থিতি গুরুতর হতে চলেছে। ফেসবুকের পোস্ট নিয়ে এমন শো–ডাউন আমি আগেও দেখেছি, কিন্তু এবারের ঘটনাটি যেন একটু বেশি অস্হিরতা সৃষ্টি করেছিল। এমন সময়ে, যাকে আমরা বলি ডিজিটাল বিপ্লবের যুগ, ফেসবুকের একটি পোস্টই কিভাবে পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিতে পারে, তা নিজের চোখেই দেখছিলাম।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন একজন ব্যক্তি ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো বলে কিছু মানুষ দাবি করল। পোস্টটা যতটা না রাজনৈতিক ছিল, তার চেয়ে বেশি ধর্মীয়, কিন্তু তাতে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোরও তো চুপ থাকার উপায় নেই। হয়তো এজন্যই আমরা দেখলাম এক অদ্ভুত মেলবন্ধন রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর মিলিত শো–ডাউন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বরাবরই অত্যন্ত জটিল, যেখানে ধর্ম একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। আর এই দুই শক্তিশালী গোষ্ঠী যখন একত্রিত হয়, তখন তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করার ধরণটাও ভিন্ন ধারায় ঘটে। ফেসবুকের পোস্ট কেন্দ্র করে ধর্মীয় গোষ্ঠী প্রথমেই রাস্তায় নামে, তাদের দাবি ছিল পোস্টদাতার শাস্তি চাই। অন্যদিকে রাজনৈতিক গোষ্ঠী তাদের ব্যাপারে নিজেদের সমর্থন জাহির করতে, নিজেদের আদর্শিক অবস্থান বজায় রাখতে শুরু করে। এইভাবে ফেসবুকের একটি পোস্ট পুরো একটা মিছিলের রূপ নেয়, যা আশেপাশের এলাকার শান্তি ভঙ্গ করে।
দৃশ্যত এটাই বোঝা যাচ্ছে, এই ধরনের শো–ডাউন শুধু একটা পোস্টের কারণে না, বরং তার পেছনে লুকানো আছে বড় বড় রাজনীতির খেলা। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার ঘটনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্ম এই কাজে আরও সহজ করেছে। এটা কেমন যেন একটা ডিজিটাল যুদ্ধের ময়দান হয়ে গেছে, যেখানে খবরের বৈধতা বা যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। যার যার মতামত, সেটা যতই ভুল বা বিভ্রান্তিকর হোক না কেন, সেটাই যেন সত্য হয়ে দাঁড়ায়।
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা আমরা পাই, তা হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের দায়িত্ববোধ কতটা জরুরি। আমরা অনেক সময় শুধু দেখার জন্য, বা বলা যায় কৌতূহল মেটানোর জন্য অনেক কিছু শেয়ার করি, মন্তব্য করি। কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবেছি, এর ফলে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারি একজন মানুষের জীবনে বা পুরো সমাজে? এমনকি এটি রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিতে কতটা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে?
একজন ব্লগার হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ, আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে ফেসবুকের মতো যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপারে জ্ঞানার্জন ও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, এটা সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রচার করা জরুরি যে কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে সেটা কতটা ভেরিফায়েড কিনা তা যাচাই করা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া। এটা একটি সামাজিক দায়িত্ব।
এখন প্রশ্ন হলো, কতটা সময় লাগবে আমাদের এই দায়িত্ব বোধ এবং সচেতনতা গড়ে তুলতে? প্রযুক্তির এই যুগে কি আমরা সক্ষম হবো সব কিছুকে যুক্তি দিয়ে বিচার করতে? ফেসবুকের পোস্ট আমাদের সমাজকে নাড়া দিবে কি না, তা নির্ভর করছে আমাদের উপরই। আমাদের সমাজ কেমন হবে, তা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমরা যাবো কোন পথে তথ্য নিয়ে খেলা না করে তা সঠিকভাবে বোঝা এবং প্রয়োগ করা, এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের সবার উচিত এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা। এখন সময় এসেছে আমাদের দায়িত্বের বোধ বাড়ানোর, যেন ফেসবুক পোস্ট আর কোনো অশান্তির কারণ না হয়।
