শিরোনামটা পড়েই মনে হচ্ছিল, ২০২১ সালটা শুরুর দিকেই কেমন যেন অস্থির ছিল। চারপাশের সবকিছুতে একটা না একটা সমস্যা লেগেই থাকে, কিন্তু মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট যখন উদ্বেগজনক সহিংসতার কথা বলছে, তখন বিষয়টা সিরিয়াস। আর ২০২১-এর প্রথম প্রান্তিকে এমন ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের সমাজের পরিস্থিতির একটি অশুভ ইঙ্গিত দেয়। মনে আছে, করোনা পরিস্থিতি তখনও ঠিকমতো সামাল দেওয়া যায়নি, তার উপর সহিংসতা! ভাবুন তো, কী এক আহামরি সময় ছিল সেটা।

বাংলাদেশে সহিংসতা কোনো নতুন বিষয় নয়। আমরা ছোটবেলা থেকেই এরকম অনেক ঘটনার কথা শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু, যখন মানবাধিকার সংস্থা খোদ উদ্বেগ প্রকাশ করে, তখন বুঝতে হবে জল অনেক দূর গড়িয়েছে। একসময় সহিংসতার প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, তবে এখন বিষয়টা অনেকটাই পাল্টে গেছে। রাজনীতি ছাড়াও সামাজিক ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, পারিবারিক কলহসহ নানা কারণে সহিংসতা বেড়েছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই সহিংসতার পেছনে আমাদের সমাজের বড় একটি ভূমিকা রয়েছে। সমাজের কাঠামো অনেকাংশেই এমন যে, সেখানে নারীর অবস্থান এখনও অনেকটাই পিছিয়ে। ২০২১-এর প্রথম প্রান্তিকেই আমরা দেখেছি নারীর উপর সহিংসতা, যা শুধু শারীরিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। সামাজিক মাধ্যমে যেন একটা অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে। ক্ষমতা, বিত্ত, এবং প্রতিপত্তির মারামারি, যার ফলে এক শ্রেণির মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।

আমাদের সমাজে মূল্যবোধের বেশ অভাব দেখা যাচ্ছে। আধুনিকতার নামে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে বিদ্রোহ আপনি লক্ষ্য করবেন, তা অনেকাংশেই সহিংসতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় যে, নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলা উচিত। কিন্তু সেই নিয়ম যখন সমাজের বড় একটা অংশ মানে না, তখন সমস্যা তৈরির সম্ভাবনা থেকেই যায়। মনে রাখবেন, সমাজ যে ধরনের মূল্যবোধ ছড়ায়, মানুষ সেইভাবেই বড় হয়। তাই আমাদের প্রথমেই সমাজের নৈতিকতা নিয়ে ভাবতে হবে।

আমার মনে পড়েছে একটা ঘটনা, সেসময় আমি এক বন্ধুর সাথে চা খেতে গিয়ে দেখেছিলাম, কিভাবে ছোট একটা কনফ্লিক্ট থেকে রাস্তায় মারামারি লেগে গেল। মানুষজন জড়ো হয়েছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ আবার চিৎকার করছে। পুলিশ আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই ধরনের ঘটনা একসময় খুবই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোট একটা ঘটনাও যেন বড় সহিংসতায় রূপ নেয়। মানুষের সহনশীলতার মাত্রা কমে গেছে, যা আমাদের সমাজের জন্য খুবই উদ্বেগজনক।

মানবাধিকার সংস্থা যে রিপোর্ট দিয়েছে, তা আমাদের সচেতন হওয়ার সময় কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এবং সাধারণ মানুষ সবারই উচিত এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে এগিয়ে আসা। এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মকে সহনশীল ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। একমাত্র এভাবেই আমরা একটি সহিংসতা মুক্ত সমাজ গড়তে পারব।

আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিও সহিংসতার একটি বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে অনেক সময় এমন কিছু মন্তব্য এবং পোস্ট দেখা যায় যা সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়। এই মাধ্যমগুলোতে অনেক সময় ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতা কম, যা তরুণ প্রজন্মকে ভুল পথের দিকে ধাবিত করছে।

মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টটি আমাদের জন্য একটি সতর্কসংকেত। আমাদের সকলের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেওয়া এবং একসাথে কাজ করে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা। যে সমাজে সহিংসতা বাড়ে, সেই সমাজ কখনোই উন্নতির পথে এগোতে পারে না। আসুন, আমরা সকলে একসাথে প্রতিজ্ঞা করি যে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর ও সহিংসতামুক্ত সমাজ দিতে পারবো।

শেষে আমি একটা প্রশ্ন রাখতে চাই, আমাদের কি সত্যিই এসব সহিংসতা থামানোর জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছি? নাকি আমরা শুধু কথা বলেই ক্ষান্ত থাকি? প্রশ্নটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর উত্তরেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। তাই আসুন, একটু সচেতন হই এবং বাস্তব পদক্ষেপ নিই। অনুরোধ, সহিংসতা মুক্ত সমাজ গড়ার জন্য আপনি কী করছেন? আপনার চারপাশের মানুষদের সাথে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করুন। হয়তো আপনার ছোট্ট উদ্যোগই বড় কোনো পরিবর্তনের সূচনা করবে।

By sukanta