শিরোনামের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এটি শুধু শব্দ নয়, একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। “উৎসবের সময় ভানুয়া-ভদ্রলোক সব চুপ, শুধু মাইকে বাড়ে ঘৃণার ভাষা”। এটি যেন আমাদের সমাজের এক টুকরো বাস্তবতা। যে সময় আমরা আনন্দের মধ্যে ডুবে থাকার কথা, সেই সময়েও কেন যেন কিছু লোকের মন থেকে ঘৃণা ঝরে পড়ে। আসলে কি হয় জানেন? উৎসবের সময় মানুষ আনন্দে মেতে থাকে, আর কিছু মানুষ সেই আনন্দের সুযোগ নিয়ে তাদের ভেতরের কালো দিকটা প্রকাশ করে দেয়। কেমন যেন একটা দ্বন্দ্ব, একদিকে গান-বাজনা, অন্যদিকে মাইকের মাধ্যমে ছড়ানো ঘৃণার ভাষা।
উৎসবের সময়টা কি শুধু আনন্দের জন্য, নাকি আমাদের সমাজের কিছু বিধ্বংসী উপাদানও এই সময়ে মাথাচাড়া দেয়? কেন যেন মনে হয়, আমাদের সমাজের কিছু মানুষ এই সময়টাকে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করে। মনে হয় একটি বিশেষ মাধ্যম রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা এই ঘৃণার বার্তাগুলো ছড়ায়। রাস্তাঘাটে মাইক বসিয়ে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে সবকিছুতেই যেন একটুখানি ঘৃণার ছোঁয়া রেখে দেয়া। এই ব্যাপারটি কি আমাদের চোখে পড়ে না, নাকি আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে সেটা উপেক্ষা করি? ভানুয়া-ভদ্রলোকরা কেন চুপ থাকে?
ভানুয়া-ভদ্রলোক বলতে আমরা সাধারণত সমাজের সেই অংশকেই বুঝি, যারা নিজেদেরকে অনেক বুদ্ধিমান মনে করে। তারা মনে করে, ঘৃণার বিরুদ্ধে কথা বললে তাদের সম্মান নষ্ট হবে। এদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষিত, সমাজের উচ্চস্তরের মানুষ। কিন্তু যখন তাদের কথা বলার সময় আসে, তারা পিছে সরে যায়। মনে হয়, তাদের হৃদয়ে কোনো শব্দ নেই। তারা কেবল চুপ করে থাকে, যেন এই ঘৃণা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু আসলেই কি তা? আমাদের সমাজের সমস্যাগুলো যদি আমরা ইগনোর করি, তাহলে কি আমরা কখনও প্রকৃত উন্নতির পথে যেতে পারব?
কীভাবে মাইকে বাড়ে ঘৃণার ভাষা? এটি একটি চিন্তার বিষয়। উৎসবের সময়, যখন মানুষ আনন্দে মেতে থাকে, তখন কিছু লোক সেই আনন্দেরই বিপরীতে কাজ করে। তারা মাইক নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ায়, একটি সমাজের বিরুদ্ধে কথা বলে, যা তাদের চোখে ভালো লাগে না। হতে পারে সেটা কোন ধর্মীয় গোষ্ঠী, হতে পারে সেটা কোন জাতিগত সম্প্রদায়। কিন্তু কারণ যাই হোক না কেন, ঘৃণা কখনও ভালো ফল দেয় না। আমাদের সমাজ কি এভাবে টিকে থাকতে পারবে?
অন্য দিকে, ঘৃণাকে প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের উদ্যোগ কতটুকু? ভানুয়া-ভদ্রলোকরা কি কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? আমাদের কর্তব্য কি হওয়া উচিত নয়, যে আমরা এই ঘৃণার বিরুদ্ধে কথা বলবো? জাতি, ধর্ম, বর্ণ অথবা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো উচিত নয়। এই ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা শুধু সমাজের বিভাজন বাড়ায়।
আমাদের সমাজে এমন কি কিছু মানুষ নেই, যারা ঘৃণার ভাষাকে প্রতিরোধ করতে পারে? অবশ্যই আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যাটা খুব কম। তাদের উৎসাহিত করার জন্য আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত। একজন মানুষের পক্ষে পুরো সমাজকে বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু যদি আমরা সবাই মিলে একসাথে কাজ করি, তাহলে অবশ্যই আমরা এ পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারব।
তবে আমাদের আগে নিজেদেরকেই বদলাতে হবে। ভানুয়া-ভদ্রলোকদের চুপ করে থাকা ছেড়ে কথা বলতে হবে। ঘৃণার ভাষাকে প্রতিরোধ করতে হবে মনের শক্তি দিয়ে। হয়তো আমরা প্রথমেই সফল হবো না, কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি আনন্দের মুহূর্ত যেন আমাদের শিখিয়ে দেয়, ঘৃণা নয়, ভালোবাসার ভাষায় কথা বলি। সমাজের সব স্তরের মানুষ যদি একসাথে এই ঘৃণার বিরুদ্ধে কথা বলে, তাহলে কি আমরা এ অবস্থার উত্তরণ করতে পারব না?
আসলে, প্রশ্নটা হলো আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত? ঘৃণার মাইক বন্ধ করার মতো সাহস কি আমাদের আছে? যদি উত্তরটা হ্যাঁ হয়, তাহলে আর অপেক্ষা নয়, আজই শুরু করা দরকার। আমাদের সুন্দর সমাজের জন্য, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, এ সময়েই আমাদের ঘৃণাকে প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু যদি আমাদের মনে দ্বিধা থেকে যায়, তাহলে বোঝা উচিত যে, এই সমাজ আরও ভেঙে পড়তে পারে। এখন সময় এসেছে, ভানুয়া-ভদ্রলোকদের মুখ খোলার। সময় এসেছে, আমাদের নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন আনার। আপনি কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?
