শিরোনামটা চোখে পড়তেই কেমন যেন একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল মনের মধ্যে। “Ain O Salish Kendra–র রিপোর্টে ২০১৩–২১ সময়ের ৩৬৭৯টি হামলা, ২০২১–এও ট্রেন্ড অব্যাহত” ভাবতেই অবাক লাগে, এতো বছর ধরে এমন ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতা আমাদের চারপাশে বিরাজ করছে। মনে হচ্ছে, এই তথ্য যেন আমাদের সমাজের এক কালো চিত্র তুলে ধরছে, যেখানে মানবতা আর নিরাপত্তার মানে যেন ক্রমশই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

আমার মনে পড়ে, ২০১৩ সালের কিছু ঘটনা। বাংলাদেশ তখন অনেক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘট এসব যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। মানুষের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক কাজ করছিল যে কখন কোথায় কী ঘটে যেতে পারে। অথচ তখনও আমাদের আশায় বুক বাঁধতে ইচ্ছে করেছিল যে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু Ain O Salish Kendra–র রিপোর্টটা দেখে মনে হলো, না, এখনও অনেক পথ বাকি।

এই ৩৬৭৯টি হামলা শুধুমাত্র সংখ্যা নয়, প্রতিটা সংখ্যা এক একটি জীবনের গল্প, তাদের কষ্টের কথা, আতঙ্কের কথা। যারা হামলার শিকার হয়েছে তাদের জীবনে এই ঘটনা শুধু শারীরিক আঘাতই নয়, মানসিক ট্রমারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনাগুলো আমাদের সমাজের প্রতি বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এমন একটি সমাজে আমরা বাস করছি যেখানে নিজেকে সুরক্ষিত ভাবার কোনো অবকাশ নেই।

আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা ভাবি, তখন এই হামলাগুলোর সংখ্যা দেখে মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আমাদের অনেক প্রত্যাশা, কিন্তু কোথাও না কোথাও যেন একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। আর এই ফাঁকটাই হয়তো সুযোগ দিচ্ছে অপরাধীদের। আমরা যখন নিরাপত্তার জন্য পুলিশের দিকে তাকাই, তখন আমাদের মনে আশার সাথে সাথে প্রশ্নও জাগে, কেন এই হামলাগুলো বন্ধ করা যাচ্ছে না?

২০২১ সালেও যখন এই ট্রেন্ড অব্যাহত, তখন মনে হয়, হয়তো আমাদের প্রয়োজন আরও কঠোর পদক্ষেপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না, মানুষের মনের পরিবর্তনও জরুরি। আর সেজন্য প্রয়োজন শিক্ষা, সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধ। আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে এই মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে কেউ আর কোনোভাবেই এমন হিংস্র কাজে লিপ্ত না হয়।

এখানে আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো, আমাদের মিডিয়া। মিডিয়া রিপোর্টিং কতটা সঠিকভাবে হচ্ছে সেটা ভেবে দেখতে হবে। Ain O Salish Kendra–র মতো প্রতিষ্ঠান যদি এই তথ্যগুলো তুলে না ধরত, তাহলে হয়তো আমরা অনেকেই এই বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত থাকতাম না। মিডিয়ার দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য যদি সঠিক সময়ে আমাদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে আমরা কি জানবো আমাদের সমাজে কি ঘটছে?

এর সাথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেন এই হামলাগুলো ঘটছে? সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত কারণে হতে পারে। তবে কারণ যাই হোক না কেন, আমাদের সমাজে এই ধরণের হিংস্রতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সমাজের প্রতিটি পেশায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা আমাদের সবার দায়িত্ব। শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, আমাদেরকেও সচেতন হতে হবে।

তাহলে এবার প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা কি করতে পারি এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য? প্রথমত, আমাদের প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা এই ধরনের হিংস্র কাজ থেকে দূরে থাকতে শিখে। এছাড়াও, আমাদের আইনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং দ্রুত করতে হবে।

যে প্রশ্নটি আমার মনে আসে, তা হলো, আমরা কি সত্যিই শান্তিময় একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারবো যেখানে সব মানুষ নিরাপদে এবং শান্তিতে বসবাস করতে পারবে? নাকি এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে, আমাদের উদাসীনতার কারণে? এই প্রসঙ্গে আমাদের সবারই চিন্তা করা উচিত এবং সময় থাকতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। কারণ আমরা জানি না, কখন আমরা বা আমাদের প্রিয়জন এই সংখ্যার মধ্যে একটি হয়ে যেতে পারি।

এই প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই, আমাদের সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মিডিয়া এবং সাধারণ জনগণ। একসাথে কাজ করলে আমরা হয়তো এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে পারবো এবং একটি নিরাপদ, সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারবো। আশার আলো এখনও আছে, তবে তার জন্য আমাদেরকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। কারণ সময় ফুরিয়ে আসছে, আর আমরা যদি এখনো উদাসীন থাকি, তাহলে একদিন হয়তো আমরা সেই চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়েও আয়োজন করতে পারবো না।