জুলাই মানে সাধারণত বাংলাদেশে বর্ষার সময়কাল। চারদিকে যখন সবুজে সবুজে ভরে যায়, তখনই আমরা দেখতে পাই অন্য এক ধরনের বৃষ্টি। এই বৃষ্টি কোনো প্রকৃতির দান নয়, বরং মানুষের লোভ আর ক্ষমতার লিপ্সার ফল। জমি–দখল–নির্যাতনের এক ভয়ঙ্কর খেলা চলে এই সময়। সংবাদপত্রে যখন আমরা দেখি ‘সিভিল কনফ্লিক্ট’ বলে উল্লেখ করা হয়, তখন অনেকেই একে সাধারণ গ্রাম্য কোন্দল ভাবতে পারেন। তবে বাস্তবতা আরেকটু গভীর এবং জটিল। বিশেষ করে যখন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি এভাবে দখল হয়ে যায়, তখন সেই জটিলতা স্পষ্টতই প্রকাশ পায়।
ঢাকা শহরের অনেকেই হয়তো এই খবরগুলো পড়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, “এ আর নতুন কী?” কিন্তু যারা প্রত্যক্ষভাবে এই ঘটনার শিকার হন, তাদের জন্য বিষয়টি যেন প্রতিদিনের একটি বজ্রাঘাত। যেমন ধরুন, কুষ্টিয়ার একটি গ্রাম। একটি হিন্দু পরিবার বহুদিন ধরে সেখানে বসবাস করছে, তাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি। কিন্তু হঠাৎ করে একদিন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এসে দাবি করতে শুরু করল যে তাদের জমি আসলে তাদের নয়। দখলের চেষ্টা চলল এবং এর সাথে শুরু হলো নির্যাতন। এসব ঘটনা কাগজে কলমে বলা হয় ‘সিভিল কনফ্লিক্ট’। তবে আমরা যারা জানি, তারা বুঝি যে এটি আসলে টার্গেটিং।
এই ধরনের ঘটনার পেছনে যে শুধু ধর্মীয় কারণ রয়েছে তা নয়, অন্য একটি শক্তিশালী কারণ হলো জমির বাজারমূল্য। বাংলাদেশের জমির দাম ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে পুঁজির লড়াইয়ে ছোটখাটো জমির মালিকরা যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, যাদের হাতে ক্ষমতার অবস্থান আছে, তারা এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। তবে যেটা দুঃখজনক তা হলো, এই লড়াইয়ে প্রতিবারই কেন যেন লক্ষ্যে পরিণত হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। যেন তাদের ধর্মীয় পরিচয়ই তাদের দুর্ভাগ্যের কারণ।
সরকার এমন অনেক আইন প্রণয়ন করেছে যা সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি রক্ষা করার কথা। তবে বাস্তবে আমরা দেখছি একরকমের অলসতা ও উদাসীনতা। পুলিশ প্রশাসন অনেক সময়ই যথাযথভাবে এই সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়। তাদের উদাসীনতা যেন দখলদারদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। এমনকি অনেক সময় প্রভাবশালীদের সাথে পুলিশের কিছু কর্মকর্তার সম্পর্ক রয়েছে বলেও শোনা যায়। যার ফলে নির্যাতিতরা কখনোই সঠিক বিচার পায় না। তাদের কণ্ঠস্বর যেন স্তব্ধ হয়ে যায় প্রশাসনিক জটিলতায়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা সাধারণ জনগণ কিভাবে এই সমস্যা প্রতিহত করতে পারি। সত্যি কথা বলতে, এই সমস্যার সমাধান রাতারাতি হওয়া সম্ভব নয়। তবে একত্রিত হয়ে কণ্ঠস্বর তুলে ধরলে অনেক সময় পরিবর্তন আসতে পারে। মিডিয়া ও সাংবাদিকদের বড় ভূমিকা এখানে। যে কোনো ঘটনার দ্রুত রিপোর্টিং এবং প্রচার মাধ্যমে তা তুলে ধরা জরুরি। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন এক নতুন সম্ভাবনার জায়গা হয়ে উঠেছে। এখানেও এই ধরনের সমস্যা তুলে ধরলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সচেতনতা বাড়ে।
আরেকটি বিষয় হলো আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনের প্রয়োজন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আমাদের সমাজের অংশ, তারা কোনোভাবেই আমাদের থেকে পৃথক নয়। তাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ আমাদের মানবতার পরিপন্থী। আমাদের উচিত তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। তাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে আমাদের পরিবারে, সমাজে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও।
আমাদের দেশে জমি নিয়ে এই ধরনের সংকট নতুন কিছু নয়, কিন্তু এর সমাধানও অন্বেষণ করা জরুরি। সত্যি কথা হলো, আমরা যদি নিজেদের মধ্যের ভেদাভেদ ভুলে একত্রে কাজ করি এবং দায়িত্বশীল হই, তাহলে জমি–দখল–নির্যাতনের এই সমস্যা অনেকাংশে কমে আসতে পারে। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে সুবিচারের বোধ গড়ে তুলতে পারি, তাহলে একদিন হয়তো সত্যিকার অর্থে সবার জন্য একটি সমান ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠবে। তবে এ প্রশ্ন থেকেই যায় আমরা কি সত্যিই সে দিনটির জন্য প্রস্তুত? এবং যদি না থাকি, তাহলে কবে থেকে প্রস্তুতি শুরু করব? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে।
