বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল কৃষি। আমাদের দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা অঙ্গাঙ্গীভাবে কৃষির সাথে জড়িত। কিন্তু এই শিল্পের মধ্যে এক অদ্ভুত এবং অন্যায় অভিযোগ আমাদের চোখে পড়ছে, যা আমাদের সমাজের এক গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। আজকের আলোচনার বিষয় হবে আদিবাসী ও হিন্দু কৃষকদের জমিতে রাতারাতি দখল ও দিনে মীমাংসার চাপ, যা প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে না, অথচ এটি একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা।

আমি ছোটবেলা থেকেই গ্রামের মেঠোপথে হাঁটা-চলা করতাম। ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাওয়া, গরুর গাড়ির শব্দ শুনে ঘুম ভাঙা এসবই আমার কাছে পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু এই চিরচেনা দৃশ্যপট আজ যেন ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারছি যে, আদিবাসী ও হিন্দু কৃষকদের জমিতে বে-আইনি দখলদারির ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। রাত্রিবেলায় চুপিসারে এসে জোর করে কৃষকদের জমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে। দিনে যখন তারা প্রতিবাদ করতে চান, তখন তাদের মীমাংসার নামে চাপ দেওয়া হয়। এ যেন এক অদ্ভুত নাটকের মঞ্চায়ন, যার শেষ পরিণতি ভয়ানক।

এই জমি দখলদারির পেছনে রয়েছে বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠী, যারা প্রায়শই রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতার বলে এই কাজগুলিকে করে চলেছে। অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসনও এই ধরণের কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে বা অন্তত চোখ বন্ধ করে থাকে। এক সময় জমির মালিকানা নিয়ে জমির মালিকের সাথে মীমাংসার নামে বসে কথিত ‘শান্তি সমাবেশ’ হয়, যেখানে আসলে কৃষকদের ন্যায্য অধিকারের বিরুদ্ধে যা কিছু হয়, তা মীমাংসা বলেই চালিয়ে দেওয়া হয়।

এমন কতগুলো ঘটনা আমি নিজেই জানি, যেখানে আদিবাসী কৃষকরা বছরের পর বছর ধরে তাঁদের জমিতে ফসল চাষ করে আসছেন। কিন্তু হঠাৎ একরাতে তারা দেখতে পান যে, তাদের জমিতে নতুন দখলদার এসে হাজির হয়েছে। তাদের বলা হয় যে, এ জমি নাকি তাদের নয়, কোনো ভুল বা অপরিসীম কারণের জন্য তাদের দখল করা হয়েছে। এরপর থেকে শুরু হয় লড়াই। আদালতের চৌকাঠ পেরিয়ে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দরজায় ঘুরতে ঘুরতে তারা হয়রান হয়ে যান। এই প্রক্রিয়া এমনিভাবে চলে যে, অনেকেই ক্লান্ত হয়ে জমি ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

এই সমস্যাটির পেছনে রয়েছে আরও গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। আদিবাসী ও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়গুলো সামাজিকভাবে অনেক সময় প্রান্তিক অবস্থায় থাকে। তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বলার শক্তি অনেক সময় থাকে না। এমনকি যখন তারা আওয়াজ তুলতেও চায়, তখন তাদের নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপ রাখা হয়। এসব ভয়ভীতি অনেক সময় শারীরিক ক্ষতির হুমকি, ব্যবসায়িক ক্ষতি বা সামাজিক বর্জনের আকারে আসে।

আমাদের সমাজে এমন শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা নিজেদের স্বার্থে অন্যদের অধিকার নিয়ে খেলতে অভ্যস্ত। তারা জানে যে, এই প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর সবার কাছে যাওয়ার সুযোগ বা ক্ষমতা নেই। তাই তারা দিনের পর দিন এই অন্যায় দখলদারি চালিয়ে যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের নিকট সহযোগিতার জন্য গেলে তারা জানিয়ে দেয় যে, মীমাংসা না করে তাদের কিছু করা সম্ভব নয়। অথচ এই মীমাংসার অর্থই হচ্ছে অন্যায় দখলদারকদের সঙ্গে আপোষরফা করা।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই ধরণের সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের সমাজকে সবসময়ই সংহতি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে আমাদেরকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। আদিবাসী ও হিন্দু কৃষকদের জমি তাদের জীবনযাপনের প্রধান মাধ্যম। এটি শুধু তাদের জমি নয়, এটি তাদের সংস্কৃতি, তাদের ইতিহাস, তাদের পরিচয়। আমরা যদি এই জমি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিই, তবে আমরা তাদের জীবনের মূলধারাকে ধ্বংস করে দিচ্ছি।

আমাদের সমাজে জমি দখলদারির এই প্রবণতাকে রুখতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। এই ধরনের বেআইনি দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এছাড়াও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। যেন তাদের অধিকার নিয়ে তারা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারে। আমরা যদি এই পথে না যাই, তবে একদিন আমাদের সমাজের এ ধরনের সমস্যা আমাদের শেষ করে দেবে।

শেষ কথা, আমরা কি স্থায়ীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করতে পারি না? নাকি আমাদের সমাজ চিরকালই এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে? আমাদের নিজেদেরই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। তাহলে হয়তো আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে পারব, যেখানে আদিবাসী ও হিন্দু কৃষকরা নিরাপদে তাদের জমিতে ফসল চাষ করতে পারবে, তাদের পরিচয় নিয়ে গর্ব করতে পারবে।