আমাদের সমাজের সবচেয়ে দুঃখজনক এবং বেদনাদায়ক ঘটনার মধ্যে অন্যতম হলো মব-নির্যাতন। ২০২২ সালের শুরুতেই এধরণের একটি ঘটনা ঘটে, যা কেবল মাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে টার্গেট করার এক অপমানজনক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে চায়, সেখানে কিছু অমানুষের কর্মকাণ্ড আমাদের পুরো সমাজকে কলুষিত করে দেয়।

মব-নির্যাতন শব্দটি শুনলেই আমাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্ট হয়। এটি এমন একটি অপরাধমূলক ক্রিয়া যেখানে একটি উত্তেজিত জনতা কাউকে পিটিয়ে বা নির্যাতন করে। ২০২২ সালের জানুয়ারির প্রথম মাসে এমন একাধিক ঘটনা ঘটে, যা আমাদের মানবিকতার পরিপন্থী এবং আমাদের সমাজের মূল ভিত্তিকেও বাধাগ্রস্ত করে।

উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো কুমিল্লার একটি ছোট্ট গ্রামে। এমন একটি গ্রাম যেখানে সকলে মিলে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করত। কিন্তু হঠাৎ করে একদিন, একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। একটি ধর্মীয় গ্রন্থের অমর্যাদার অভিযোগে গ্রামের মানুষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং তারা একজন নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে টার্গেট করে। সেই ব্যক্তিকে তারা খুব নির্মমভাবে নির্যাতন করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সেই ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। এই ধরনের একটি ঘটনা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি আমাদের সমাজের সামগ্রিক মানবিকতার উপর এক জঘন্য আঘাত।

এই ধরনের ঘটনাগুলো আমাকে বিশেষভাবে দুঃখ দেয়। আমরা যখন চায়ের দোকানে বসে বা বাসায় টিভির পর্দায় এসব খবর দেখি, তখন মনে হয় যেন আমরা অনেক দূরে বসে কল্পনাও করতে পারি না যে, আমরা নিজেরাও এমন ঘটনার শিকার হতে পারি। কিন্তু সত্য হলো, যে সমাজে আইন নিজ হাতে তুলে নেয়া যায়, সেখানে প্রত্যেকেই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এমনকি আপনি বা আমিও।

মব-নির্যাতনের মূল কারণগুলো খুঁজে বের করতে গেলে আমরা দেখতে পাই, এটি ঘটে মূলত গুজব, ভুল ধারণা এবং মানুষের ভিতরে জমে থাকা রাগ ও ক্ষোভের কারণে। যখন কোনো একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ বা অসহিষ্ণুতা থাকে, তখন এটি সহজেই মব-নির্যাতনের রূপ নিতে পারে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক শিক্ষা বা সামাজিক শিক্ষা যদি মানুষকে সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঠ না দিতে পারে, তবে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর একটি বড় সমস্যা হলো, আমাদের দেশের আইনের বাস্তবায়ন দুর্বল। অনেক সময় এমন হয় যে, অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকরে পালিয়ে যায় বা তাদের যথাযথ শাস্তি হয় না। এই কারণে অনেকেই আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ খুঁজে পায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আইন নিজ হাতে তুলে নেয়া কখনোই সমাধান হতে পারে না, বরং এটি সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা বিনষ্ট করে।

এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা এমন ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারি? প্রথমত, আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি মানুষকে বোঝাতে হবে যে, গুজবে কান না দেয়া এবং উত্তেজিত হয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়াই সবচেয়ে সঠিক পথ। এছাড়া, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন পাঠ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা মানুষকে মানবিক মূল্যবোধ এবং সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে আলোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রশাসনকেও সক্রিয় হতে হবে এবং এমন ঘটনার প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, আমাদের সমাজে সুস্থ ধারার ধর্মীয় চর্চা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার বাতাবরণ তৈরি করতে হবে। আমরা একত্রে থাকলে এবং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকলে, কোনো মব-নির্যাতনের স্থান হবে না। আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার। আমাদের সমাজে সহিষ্ণুতা থাকলে, কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে টার্গেট করা হবে না। প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি প্রস্তুত এমন একটি সমাজ গড়তে যেখানে শান্তি, সহিষ্ণুতা এবং নিরাপত্তা সবার জন্য নিশ্চিত?

By rimjhim