শিরোনামটি দেখেই আমার মনে হলো, কোথাও কিছু একটা ভয়াবহ হয়ে গেছে। “বৌদ্ধ গ্রামে রাতের হামলা, ভোরে সাংবাদিকদের ঢুকতে বাধা” এ ধরনের ঘটনা সাধারণত খুব দুর্ভাগ্যজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। আমার মনে হলো, এখন যদি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বসে শোনাই এমন একটি গল্প, তা হয়তো অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে, আবার অনেকের মনে ভয় এবং উদ্বেগের সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যখন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও কিছু দুর্বৃত্তশ্রেণীর মানুষের কারণে সম্প্রীতির বাতাবরণে মাঝে মাঝে কালো মেঘ জমে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গ্রামে হামলার ঘটনা শুনে মনটা সত্যিই ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। ভাবতে থাকি, আমরা কি সত্যিই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অন্ধকার সময়গুলো কাটিয়ে উঠতে পারব?

গ্রামের নাম বললে হয়তো অনেকের মনে পড়বে, এটা তাদেরই একান্ত পরিচিত কোনো জায়গা। সেখানকার মানুষদের সাথে আমাদের সম্পর্ক নেই বললেই চলে, কিন্তু আমি মনে করি, প্রতিটি গ্রামের নিজস্ব কিছু গল্প থাকে, যা আমাদের সকলের জানার অধিকারও রয়েছে। সেই গ্রামেই যখন এমন একটি ঘটনা ঘটে, তা শুধু কাকেই নয়, পুরো জাতির কলঙ্ক হিসেবেই ধরা থাকে।

আমার যেসব বন্ধু সাংবাদিক পেশায় কাজ করেন, তাদের সাথে কথা বলে জানলাম, সেদিন তারা যখন ওই গ্রামে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের পথরোধ করা হয়। এমনকি, তাদের সাথে দুর্ব্যবহারও করা হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা আমার মনে এক ধরনের বিস্ময় এবং ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সাংবাদিক পেশাটা যেই কষ্ট সহ্য করার পেশা, তবু তাদের জন্যেও এমন বাধা কেন সৃষ্টি হবে? সত্যের খোঁজে যাওয়ার এই অনিবার্য প্রয়াসটাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা কেন করা হবে?

রাতের অন্ধকারে যারা এই হামলা চালিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল? তারা কি ভাবছিল যে, এইভাবে আক্রমণ চালিয়ে তারা নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারবে? আমি জানি না, এ ধরনের হামলার পেছনে কতটা কৌশল কাজ করে। কিন্তু এটুকু জানি, এই ধরনের হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে এই ধরনের মনোভাবের পরিবর্তন আনতেই হবে।

সাংবাদিকদের ঢুকতে বাধা দেয়া সেই দিনটির কথা মনে পড়ে গেলে আমার মনে হয়, আমরা কি তবে সত্যের ভয়ে এতটাই সন্ত্রস্ত? সাংবাদিকরা যারা সেই গ্রামে পৌঁছেছিল, তারা তো শুধুমাত্র সত্য ঘটনা তুলে ধরার উদ্দেশ্যে গিয়েছিল। তাদের কাজ তো সমাজ এবং দেশের সেবা করাই। অথচ, তাদের বিপরীতে এমন আচরণ করা সত্যিই লজ্জাজনক।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে বসবাস করি এবং আমাদের মধ্যে ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। কিন্তু যখনই এমন কোনো ঘটনা ঘটে, তখন আমার মতো সাধারণ মানুষের মনে অসংখ্য প্রশ্ন জাগে। বৌদ্ধ গ্রামে রাতে হামলা এবং পরের দিন সাংবাদিকদের বাধা দেয়া, এসব ঘটনার পেছনে কারা এবং কেন এই প্রশ্নগুলো কি আমাদের সবাইকে ভাবায় না?

আমার বিশ্বাস আমাদের সমাজে পরিবর্তন আনা সম্ভব। যদি আমরা সত্যিই আন্তরিকভাবে একসাথে কাজ করি এবং আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে সম্প্রীতির বীজ বপন করতে পারি, তাহলে আর এমন কোনো খারাপ দিন দেখতে হবে না। আমরা সবাই যদি একে অপরের মতামত এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি, তাহলে সত্যিকার অর্থেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

শেষমেশ, আমার মনে হয়, এই ধরনের ঘটনার পর আমাদের সকলেরই একটু থেমে ভাবা উচিত। আমরা কি সত্যিই এমন সমাজ চাই, যেখানে রাতের অন্ধকারে ভয়ের ছায়া নেমে আসে? যেখানে সাংবাদিকদের সত্যের খোঁজে যাওয়া রুদ্ধ করা হয়? আমাদের উচিত হবে আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন আনা এবং প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন সমাজ রেখে যাচ্ছি, তা নিয়ে ভাবা উচিত। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজেদের মধ্যে সেই পরিবর্তন আনার সাহস পাবো?

By nandini