জানি না আপনারা কেউ গত কয়েক বছরের মধ্যে থানায় গিয়েছেন কিনা। এই অভিজ্ঞতা যদি আপনার না থেকে থাকে, তবে নিজের ভাগ্যবান বলতেই পারেন। কারণ আমাদের দেশের থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে গেলে যে অভিজ্ঞতা হয়, সেটা অবর্ণনীয়। বিশেষ করে যদি আপনি একজন সাধারণ মানুষ হন এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান। ‘অভিযোগ তুললে বিপদ হবে’ এমন কথা শুনে এসে থানায় যে নতুন করে হুমকি পাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়, সেটা তো এখন আমাদের অনেকের কাছেই পরিচিত বিষয়ের মতো।
আমাদের সমাজে অপরাধের শিকার হলে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য থানা হলো প্রথম আশ্রয়। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, এই প্রথম আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে নতুন এক বিপদের সূচনা। আপনি যদি থানায় যান এবং প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, তাহলে একবার ভাবুন আপনার মাথার উপর কতটা চাপ আসবে। আমাদের সমাজের নিয়মের ছাঁদে গড়া যে কাঠামো, সেখানে প্রভাবশালীরা নিজেদের ইচ্ছামত চালিয়ে যায়, আর সাধারণ মানুষ হয়ে যায় নিরুপায়।
তাহলে কেন এমন হয়? কেন থানায় গিয়ে নতুন করে হুমকির শিকার হতে হয়? আসলে আমাদের দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যে বৈষম্য এবং ঘাটতি রয়েছে, সেটা একটি বড় কারণ। বিশেষ করে আমাদের থানাগুলোতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, থানার কর্মকর্তারা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষে কাজ করেন বা তাদের কাছ থেকে প্রভাবিত হন। আর সাধারণ ভুক্তভোগীরা তখন হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। যেমন ধরুন, একজন নারী যদি তার বিরুদ্ধে হওয়া যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থানায় করতে যান, তাকে উল্টো নানা রকমের অসম্মানজনক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, এমনকি তার অভিযোগকে গুরুত্বহীন করে দেখানো হয়।
একজন ভুক্তভোগীর জন্য থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে যাওয়া মানেই যেন নতুন করে মানসিক অত্যাচার সহ্য করা। এমনকি অভিযোগ না তুলতে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীকে বোঝানো হয় যে, অভিযোগ করলে তার ক্ষতি হবে। কখনো কখনো সরাসরি বলা হয় যে, মামলা তুলে না নিলে আরও বড় বিপদ আসবে। এসব ঘটনা শুনলে সত্যিই মন ভেঙে যায়। আমরা কি আদৌ কোনোদিন আমাদের থানাগুলোকে সাধারণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে পাবো?
অবশ্য, বলতে হবে যে সব থানারই এক অবস্থা নয়। কিছু কিছু থানায় যখনই আমরা স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা দেখি, তখন সে এক আলাদা অনুভূতি। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা এতই বিরল যে সেটাকে ব্যতিক্রম বলেই ধরতে হয়। তাহলে কেন এই বিরলতা? কেন থানাগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না? আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সবসময় জনপ্রিয়তা আর মানুষের আস্থা অর্জনের সুযোগ থাকে, কিন্তু সেই সুযোগ তারা কতটা কাজে লাগাতে পারে সেটাই প্রশ্ন।
একটি জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে থানাগুলোতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যেখানে অফিসারদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অভিযোগ শোনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সেইসাথে, কোনো অভিযোগ এলে সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার ব্যবস্থা করা উচিত। যদি কেউ অভিযোগ তুলে নেয়, তবে কেন সেই অভিযোগ তুলে নেওয়া হলো, সেটারও তদন্ত হওয়া উচিত। অবশ্যই থানাগুলোর উপর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যখন প্রত্যেকটা অভিযোগ সঠিকভাবে তদন্ত হবে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে, তখন সাধারণ মানুষ থানায় যেতে ভয় পাবে না।
আমাদের এমন একটি সমাজ প্রয়োজন যেখানে ন্যায়বিচার কেবল একজন প্রভাবশালীর সুবিধার জন্য নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিশ্চিত করা হবে। থানাগুলো হবে আমাদের নিরাপত্তার প্রথম ঠিকানা, হুমকির নতুন ঠিকানা নয়। আজকের এই সমাজে আমাদের উচিত থানাগুলোকে সেই পরিবর্তনের পথে নিয়ে যাওয়া। আমরা কি পারবো আমাদের থানাগুলোকে সত্যিকার অর্থে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে? নাকি সবসময় আমাদের ভাবতে হবে, ‘অভিযোগ তুললে বিপদ হবে’? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।
