ভূমি দখলের হালনাগাদ মানচিত্র: খুলনা–বরিশাল–রংপুরে সংখ্যালঘুদের জমি হাতবদল

প্রিয় পাঠক, আজকের আলোচনায় এমন এক বিষয় নিয়ে কথা বলব যা হয়তো অনেকেরই জানা আছে, তবে সবার জানা উচিত। আমাদের প্রিয় দেশ বাংলাদেশ, যেখানে ভূমি দখল ও জমি হাতবদল খুবই সাধারণ ঘটনা, সেখানেই আমরা ক্রমাগত সংখ্যালঘুদের জমি হারানোর করুণ কাহিনী দেখি। এ যেন প্রতিদিনের সংবাদ। খুলনা, বরিশাল, এবং রংপুরের কথা যদি বলি, তবে এই তিন অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের জমির হাতবদল যেন এক অবিরাম ধারায় পরিণত হয়েছে।

আসুন খুলনার কথাই ধরা যাক। খুলনার মাটি যেন তার নিজের জন্য লড়াই করা মানুষদের চিৎকার শুনতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আপনি জানেন, একটা সময় ছিল যখন এই মাটি সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার আশ্রয় ছিল। কিন্তু দিনে দিনে সেই নিরাপত্তার বেষ্টনী ভাঙতে শুরু করে। জোরপূর্বক জমি দখল, নকল দলিল তৈরি এবং ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে জমি হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা খুলনায় যেন প্রতিদিনকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত বড় সমস্যার সমাধান যদি কখনো হয়, তবে তা কেবলমাত্র আমাদের সচেতনতা, আইনের সমর্থন এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই সম্ভব।

বরিশালের অবস্থা খুলনার মতোই। এখানে সংখ্যালঘুদের জমি হাতবদলের ঘটনা শুধু আর কাগজ-কলমে নয়, জীবনের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে। সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বরিশালে প্রতিনিয়তই সংখ্যালঘুদের জমির ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখানে কেউ জমি কিনতে গেলে প্রথমেই তাকে ষড়যন্ত্রের জালে পা দিতে হবে। জমির প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করতেও বহু কাগজপত্র ঘাটতে হয়, আর সেখানেই নতুন করে প্রয়োজনীয় কাগজের ঘাটতি দেখা দেয়। কেউ যখন নিজের মালিকানা প্রমাণ করতে চায়, তখনই তার সামনে নানা বাধার সৃষ্টি হয়। অবৈধ চক্রান্তকারীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জমি হাতিয়ে নেয়।

রংপুরেও একই ধাঁধা। এখানে সংখ্যালঘুদের জমি হাতবদলের ঘটনা যেন এখন সাধারণ নিয়ম। জমির মালিকানা নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হওয়া মানুষদের গল্প প্রতিদিনই শোনা যায়। রংপুরের সাধারণ মানুষের মুখ থেকে শোনা যায়, “নিদেন পক্ষে আইনের শাসন যদি ঠিকঠাক থাকত, তাহলে এই কষ্টগুলো সহ্য করতে হতো না।” রংপুরে এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে সংখ্যালঘুরা নিজেদের জমির মালিকানা হারিয়ে তাদের জীবিকার প্রধান উৎসও হারিয়েছেন।

প্রায়ই আমরা শুনি, “কেউই জমি নিয়ে কিচ্ছু করতে পারবে না,” কিন্তু বাস্তবে যা দেখি তা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের আশার প্রদীপকে নিভিয়ে দেয়। আমরা দেখেছি কিভাবে জমির নকল দলিল তৈরি করে জমির প্রকৃত মালিকদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেক সময় সঠিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। অনেকেই আবার ভীত হয়ে নিজেদের জমির অধিকারের জন্য লড়াই করতে চান না কারণ তারা জানেন যে তাদের প্রতিপক্ষ খুবই শক্তিশালী।

এখানে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায় বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও, আমরা কি আদৌ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি দিতে পেরেছি? দেশে যখন প্রতিনিয়ত উন্নয়নের ধারা বইছে, তখন কীভাবে আমরা একটি অংশকে এই উন্নয়নের বাইরে রেখে দিচ্ছি? সংখ্যালঘুদের জমি হাতবদলের এই করুণ চিত্র আমাদের সমাজের একটি ভয়ানক ছবি তুলে ধরে। জমির মালিকানা নিয়ে এইসব সংঘাত শুধু আইনি সংঘাতই নয়, বরং একটি সামাজিক ও নৈতিক সংঘাতও।

অতএব, আমাদের এখনই সময় এসেছে চিন্তা করার আমরা কি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়বিচারমূলক সমাজ রেখে যেতে পারব? না কি আমাদের এই অবহেলার জন্য ভবিষ্যতেও এই সংখ্যালঘুরা জমি হারানোর কষ্টে থাকবে? আমরা কি আদৌ একটি সমৃদ্ধ এবং সুশৃঙ্খল বাংলাদেশ কল্পনা করতে পারি যদি আমাদের সমাজের এই অংশটি প্রতিনিয়ত অস্থিরতার শিকার হয়? আশা করি এই প্রশ্নগুলো আমাদের সকলকে ভাবাবে এবং আমাদের সঠিক পথ বেছে নিতে সাহায্য করবে।

By rimjhim