শিরোনামটি শুনে প্রথমেই আমার মনে হলো, আমরা যেন এক অদ্ভুত যুগে বাস করছি। যেখানে উন্নয়ন মানেই একপক্ষের বিজয়, আরেকপক্ষের পরাজয়। তো চলুন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে শুনে নেওয়া যাক এক হিন্দু কৃষকের গল্প যারা তাদের জমি হারিয়ে এক প্রান্তিক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন।

আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে গেলে আপনি দেখতে পাবেন, কেমন করে এখানে মানুষ প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে জীবন কাটায়। সে এক সহজ-সরল জীবন, যেখানে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে দিন শুরু হয় আর সূর্যাস্তের সাথে সাথেই দিন শেষ। কিন্তু এই সহজ-সরল জীবনও যেন আজ বিপন্ন। উন্নয়নের নামে সেই জীবনযাত্রায় এসেছে নানা পরিবর্তন, আর সেই পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকরা।

আমাদের দেশের উন্নয়ন মানে अक्सर বড় বড় ভবন, শিল্প কলকারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং সেই সাথে গ্রাম্য জীবনের পরিবর্তন। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে গিয়ে আমরা কি কখনো ভেবেছি, কারা এর জন্য সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে? এই উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে ধাপে জমি নষ্ট হয়েছে কৃষকদের, আর সেই ক্ষতির কারণেই আজ আমরা শুনতে পাচ্ছি জমি হারানো এক হিন্দু কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।

গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, জমি শুধু একটা টুকরো মাটি নয়, এটা মানুষের জীবিকা, তাদের সংস্কৃতি, তাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন এই জমিকে কেড়ে নেওয়া হয়, তখন তা শুধু মাটি হারায় না, সেই সাথে হারিয়ে যায় জীবনের চালিকা শক্তি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিশেষ কোনো বিচার বা ন্যায়বিচার দেখা যায় না, কারণ সব সময়ই বড় বড় প্রকল্পের জন্য স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় কম।

এই প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল। তার গ্রামের বাড়ি ছিল এক সুন্দর সবুজ ভূমিতে। সরকারি প্রকল্পের কারণে সেই জমি অধিগ্রহণ করা হয়, আর তার পরিণতিতে তার পরিবারকে শহরে স্থানান্তরিত হতে হয়। শহরে এসে তারা হয়তো টাকার মুখ দেখেছে, কিন্তু হারিয়েছে সেই মাটির গন্ধ, হারিয়েছে সেই আত্মিক সংযোগ যা তাদের গ্রামের জীবনকে অর্থপূর্ণ করত। এটা কি সত্যিকারের উন্নয়ন?

এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, জমি হারানোর ব্যথা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবও। বিশেষভাবে প্রান্তিক হিন্দু কৃষকদের জন্য এই ক্ষতি আরো গভীর। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তা যখন ভেঙে যায়, তখন তাদের জন্য এই ক্ষতি যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। জমি হারানো মানে শুধু জীবিকা হারানো নয়, তাদের শিকড়ও যেন হারিয়ে যায়।

আজকের সমাজে যেখানে আমরা নিজেদেরকে আধুনিক এবং প্রগতিশীল বলে দাবি করি, সেখানে কি এমন উন্নয়ন আমাদের কাম্য? উন্নয়ন তো সেই হওয়া উচিত যা সবাইকে সাথে নিয়ে আসে, যা কারো ক্ষতি করে না বরং সবাইকে সঙ্গী করে উন্নতির পথে নিয়ে যায়। আমার মতে, যদি উন্নয়ন হতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন হওয়া উচিত মানবিক, যেখানে স্থানীয় জনগণের মতামত এবং তাদের জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শিত হয়।

এই প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবতে বসলে মনে হয়, আমরা যেন দারুণ একটি টানাপোড়েনে আটকে আছি। একদিকে আমাদের প্রয়োজন উন্নয়ন, আর অন্যদিকে সেই উন্নয়ন যেন জীবন থেকে কেড়ে নিচ্ছে অনেক কিছু। এক হিন্দু কৃষকের দীর্ঘশ্বাস যেন সেই সব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে যারা এই সংগ্রামে নিজেদের হারিয়েছে।

আমরা যদি এই ধরাতে খুঁজে পাই সত্যিকারের উন্নয়ন, তবে সেটাই হবে আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। উন্নয়ন তখনই হবে সার্থক, যখন আমরা সবার জন্য একটি সমতল ক্ষেত্র তৈরি করতে পারব, যেখানে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিতে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারবে। এটাই হতে পারে সেই প্রশ্ন, যার সাথে আমরা প্রতিনিয়ত টক্কর দিয়ে যাচ্ছি – উন্নয়নের নামে আমরা কি সত্যিই সবার কল্যাণ করছি, নাকি নিজেরাই নিজেদের শিকড় কেটে ফেলছি?