সকালের চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে আছি বারান্দায়, তখনই হঠাৎ মনে হলো সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা নিয়ে কিছু কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা উচিত। একটা ভয়ানক বিষয় আমাদের সমাজে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নিয়ে আমরা হয়তো খুব একটা আলোচনা করি না। তবে চুপচাপ থাকলে তো আর সমাধান আসবে না। কিছুদিন আগে খবরের কাগজে চোখ বোলাতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে পড়লাম, “হিন্দু মেয়েদের টার্গেট করে অপহরণ–বিয়ে” এই বিষয়টি আমাদের সমাজে একটি নীরব দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দু মেয়েদের টার্গেট করে অপহরণ ও তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ম পরিবর্তন করে বিয়ে করার প্রবণতা দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, এই ধরনের ঘটনা কোনো ধোঁয়াশার মধ্যে নেই, বরং এটি খুবই বাস্তব। কয়েক বছর আগে যখন আমার এক সহকর্মীর মেয়ে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়, তখন আমরা সবাই চিন্তিত হয়ে উঠেছিলাম। পরে জানতে পারলাম, সে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পুলিশ প্রশাসনও এ বিষয়ে চুপ থাকল। যেন এটাই যেন সাধারণ একটা ঘটনা।

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, এই ধরনের ঘটনা তো কোথাও কোথাও ঘটে থাকে, তবে সেটা এত বড় সমস্যা হতে পারে কী করে? কিন্তু যারা এই পরিস্থিতির শিকার, তাদের কাছে এটি একেবারে জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। একজন বাবা-মা যখন তাদের মেয়েকে নিরাপদে ঘরে আনতে পারেন না, তখন সেই যন্ত্রণা বোঝানোর ভাষা থাকেনা।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের মধ্যে এই ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর কমপক্ষে কয়েক ডজন হিন্দু মেয়ে এই ধরনের বর্ণবাদী অপরাধের শিকার হয়। অথচ পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না। তারা যেন নিঃশব্দে সবকিছু মেনে নেয়, আর আমরা সাধারণ মানুষও এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারি না।

হয়তো আপনারা ভাবছেন, এই বিষয় নিয়ে তো মিডিয়ায় খুব একটা শোরগোল হয় না, তবে কেন এই ব্যাপারটা নিয়ে এত উদ্বেগ? কারণ, হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা দিনে দিনে কমছে, আর এর পেছনে এই ধরনের সামাজিক অবিচার ও নিরাপত্তাহীনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে একটি জনগোষ্ঠী যদি নিজেদের নিরাপত্তা বোধ করতে না পারে, তাহলে সেটি পুরো জাতির জন্যই লজ্জার।

আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটছে? কেন কিছু মানুষ ধর্মান্তরিত ও বিয়ে করার জন্য এই ধরনের নিন্দনীয় পন্থা অবলম্বন করে? সমাজের একটি বড় অংশ এখনো শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। কিছু মানুষ ধর্মীয় উগ্রতার বশবর্তী হয়ে এই ধরনের কাজ করে ফেলে, অথচ তারা জানে না এই ধরনের কাজের পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে।

আসলে আমাদের সমাজের মূল সমস্যায় ধরতে হবে। একটি মেয়ের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বিয়ে হওয়া কোনো ছোট বিষয় নয়। এটি একটি মানুষের জীবনের সব থেকে বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কিন্তু সমাজের কিছু অংশের মানুষ এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বহীন মনে করে এবং নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। এই সিস্টেমকে ভাঙতে হলে আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের করণীয় কি? প্রথমত, প্রশাসনের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। তাদের কাছে আমাদের দাবি হবে, তারা যেন এই ধরনের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ নেয়। আর যদি প্রশাসন তা না করে, আমাদের উচিত হবে সঠিক পথে আন্দোলন করা।

দ্বিতীয়ত, আমাদের নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সন্তানদের বোঝাতে হবে যে, ধর্মান্তরিত করার জন্য বা কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য চাপ দেওয়া যাবেনা।

শেষ বেলায় একটা কথাই বলব, আমাদের নিজেদেরই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি না করলে, তারা কখনোই এই বিষয়ে সক্রিয় হবে না। আর আমরা যদি নিজেদের মধ্যে পূর্বাপরের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা না করি, তবে আমরা কখনো এই ধরনের দূষণ থেকে মুক্তি পাব না। আমাদের দরকার একটি সংবেদনশীল সমাজ, যেখানে সকল ধর্মের মানুষ নিরাপত্তা ও সম্মানের সাথে বাস করতে পারে। আপনারা কি মনে করেন? আমরা কি সেই সমাজ তৈরি করতে পারব?

By nandini