শিরোনামটি বেশ আকর্ষণীয় এবং আমি মনে করি এটি আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। “আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর ‘হেভি সিকিউরিটি’, কিন্তু পুরোনো মামলার ন্যায়বিচার অদৃশ্য এই শিরোনামটি শুনলে মনে হয় আমরা যেন একটি সিনেমার ট্রেলার দেখছি যেখানে পুলিশের কার্যকলাপ নিয়ে বড় কোনও চমকপ্রদ ঘটনা ঘটবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এটি আমাদের দেশের বাস্তব পরিস্থিতি।

একটি ছোট্ট উদাহরণ দিই। ধরুন, বাংলাদেশে কোথাও কোনো বড় রাজনৈতিক সমাবেশ রয়েছে। সেই এলাকা ঘিরে যে পরিমাণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকে, তা সত্যিই অবাক করার মতো। ঢাকার মাঠ গুলোতে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। পুলিশ, র‍্যাব, অ্যাম্বুলেন্স থেকে শুরু করে এমনকি ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও প্রস্তুত থাকে। যেন পুরো একটি সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এটাকে খারাপ বলা যাবে না, কারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা সত্যিই জরুরি। কিন্তু এর পাশাপাশি, সেইসব পুরোনো মামলাগুলো যা বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে কোর্টের ধুলো জমা ফাইলে, সেগুলোর কি হবে?

আমাদের বিচার ব্যবস্থায় একেকটা মামলা একেকভাবে বছরের পর বছর গড়াতে থাকে। একটি মামলা যখন শুরু হয়, তখন বিচারপ্রার্থীর মনে থাকে একটি আশা, ন্যায়বিচার পাবার আশা। কিন্তু সেই আশার আলো অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায় কোর্ট, পুলিশ, আইনজীবী আর অসংখ্য ফাইলের ধুলোর নীচে। আমরা যতই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সিকিউরিটি নিয়ে গর্ব করি না কেন, আমাদের বিচার ব্যবস্থার এই ধীরগতি আমাদের উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন কিছু মানুষের সাথে কথা বলেছি যাদের পুরোনো মামলা এখনো কাঙ্ক্ষিত সমাধানের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের কাহিনী শুনতে গেলে মনে হয় যেন তারা এক ধরনের বন্দিত্বের জীবনযাপন করছে। একটি মামলার জন্য শুধু টাকা আর সময় নষ্ট হচ্ছে না, বরং এটি তাদের জীবনে একধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। অনেকেই এখানে বলতে পারেন যে এটি শুধুমাত্র আমাদের দেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার একটি সাধারণ সমস্যা। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমাদের যদি সদিচ্ছা থাকে তবে সমাধান সম্ভব।

পূর্বে এমন অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল যেখানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা ছিল। কিছু ক্ষেত্রে এটি সফল হয়েছে, তবে পুরোনো মামলা গুলোর ক্ষেত্রে সেই সফলতা এখনো অধরা। এর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, আমাদের বিচার ব্যবস্থায় জনবল সংকট। বিচারক ও আইনজীবী যতই পরিশ্রম করুক না কেন, মামলার পরিমাণ এত বেশি যে তাদের পক্ষে সঠিক ও দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের অদক্ষতা বা অনীহা। অনেক সময় দেখা যায়, তদন্তে গাফিলতি বা দুর্নীতির কারণে মামলার সঠিক রায় দিতে বিলম্ব হয়। এ বিষয়গুলো আমাদের বিচার ব্যবস্থার গতি কমিয়ে দেয়।

একটি শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিতে পারি, যেখানে একটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সেখানে তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলার সমাধান করে। এটি কি আমাদের দেশের জন্যও কার্যকর হবে? সম্ভবত হ্যাঁ, তবে আমাদের সেই ব্যবস্থাকে নিজের দেশের প্রেক্ষাপটে মানিয়ে নিতে হবে। আমাদের বিচারকদের আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত এবং একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো উচিত। ই-জুডিশিয়ারি সিস্টেম চালু করলে ফাইলের ধুলো জমানো থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারি।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ শুধু বর্তমান পরিস্থিতি সামলানো নয়, পুরোনো মামলা গুলোতেও নজর দেওয়া উচিত। তাদের কাছে থাকা তথ্যগুলো যদি দ্রুত বিচার ব্যবস্থার হাতে পৌঁছতে পারে তবে অনেক মামলার সমাধান দ্রুত হতে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরি করা উচিত যেখানে পুলিশ ও কোর্টের মধ্যে তথ্য বিনিময় দ্রুত হবে।

সবশেষে আমি বলতে চাই, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দিয়ে আমাদের সমাজের সত্যিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একটুকরো ন্যায়বিচার যা বহু মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে, তার জন্য আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আপনার মতামত কি? আপনি কি মনে করেন যে আমাদের বিচার ব্যবস্থা দ্রুতগতি লাভ করতে পারে, নাকি এটি শুধুই কল্পনা?

By nandini