আমাদের চারপাশে যখনই নির্বাচনের ঢাক বাজে, তখনই দেখা যায় রাজনীতিবিদদের একটি ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। ফেসবুক, টুইটার কিংবা ইনস্টাগ্রামের মত সামাজিক মাধ্যমগুলো যেন তাদের মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, এই অনলাইন কার্যকলাপ কি আদৌ মাঠের মানুষের সাথে তাদের সংযোগ স্থাপন করতে পারে? চলুন আজ একটু বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি।

ফেসবুকে আমরা দেখছি বড় বড় পোস্ট, ছবি, ভিডিও। রাজনীতিবিদরা প্রতিদিন তাদের কাজের অগ্রগতি, জনসেবার গল্প কিংবা নিজেদের দর্শনকে তুলে ধরেন। কিন্তু এই প্রশ্নটি মনে জাগে যে, ফেসবুকে পোস্ট করা এইসব কন্টেন্ট কি বাস্তবতার সাথে মিলে? অথবা এগুলো কি শুধুই জনমত গঠনের একটি কৌশল? মাঠে যখন আমরা যাই, তখন কি সেই একই চিত্র দেখতে পাই? নাকি ফেসবুকের জগৎ এবং বাস্তবতার মাঝে বিশাল ফারাক রয়েছে?

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা যে চিত্র তুলে ধরেন তা একপাক্ষিক। কারণ মাঠের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধরে নিন, একদিন সকালে আপনি কোন গ্রামের দিকে যাত্রা করলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন, পথঘাট খারাপ, পানির কষ্ট, বিদ্যুতের অভাব, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সমস্যা। কিন্তু সেই একই রাজনীতিবিদ তার সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে গ্রামে উন্নয়নের ঝড় তোলার গল্প শেয়ার করেছেন। এই সব দেখলে মনে হয় যেন দুটো ভিন্ন জগৎ।

আমাদের দেশে ফেসবুক একটি বিশাল প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে মানুষের ভাবনা, প্রতিক্রিয়া এবং সমালোচনা উঠে আসে। রাজনীতিবিদদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করার। কিন্তু বাস্তবিক উন্নয়ন কি শুধুই ফেসবুকের মাধ্যমে সম্ভব? একটি প্রকৃত উন্নয়নের জন্য যেখানে দরকার সঠিক পরিকল্পনা, ত্যাগ এবং মাঠের কাজ সেখানে ফেসবুক পোস্ট কি শুধুই একধরনের প্রচারণা হয়ে থাকছে না?

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময় দেখা যায় রাজনীতিবিদদের ফেসবুক পোস্টগুলো এক ধরনের ছকবদ্ধ প্রচারণার মতো। তারা হয়তো একটি নির্দিষ্ট সময়ে মাঠের কোথাও গিয়েছেন, কিছু কাজ করেছেন এবং তার ছবি তুলে এনে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। কিন্তু এই সামান্য কাজ কি পুরো সমাজের জন্য পর্যাপ্ত? বাস্তবে মানুষ যখন সমস্যায় পড়ে, তখন ফেসবুক পোস্ট তার কোনো সমাধান দিতে পারে না।

মাঠের শূন্য ঘরের কথা বলতেই মনে হয় যখন আমরা কথা বলার জন্য কোনো নেতার অনুমতি চাই, তখন অনেক সময় সেই শূন্য ঘরের চিত্রই দেখতে পাই। হয়তো তিনি ঢাকায়, কিংবা অন্য কোথাও, ব্যস্ত। এই শূন্যতা যে কত বড় ক্ষতি করে, তা আমরা মাঠের মানুষ যারা নিয়মিত কাজ করি, তারা ভালোই বুঝি। কারণ রাজনীতিবিদদের অনুপস্থিতি মানেই আমাদের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে আরেকটি দিন অপেক্ষা।

আমরা যদি একটু পিছনে তাকাই, আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের ক্যারিশমায় ভরপুর প্রচারণার উদাহরণ কম নেই। কিন্তু সেই প্রচারণার বাস্তব প্রতিফলন কতটুকু? ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জনমত গঠন করা যায় ঠিক, কিন্তু মাঠের সত্যিকারের উন্নয়ন করতে হলে দরকার নেতৃত্বের। দরকার দায়িত্বশীলতার। এবং সবচেয়ে বেশি দরকার মানুষের সমস্যাগুলো কানে নেয়ার মনোভাব। এই মনোভাব যদি ফেসবুক পোস্টের বাইরে না থাকে, তবে সেটি শুধুই একধরনের প্রচারণা।

উন্নয়নের জন্য ফেসবুক পোস্ট একটি মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই মাঠের কাজের বিকল্প হতে পারে না। মানুষ তার চোখে দেখতে চায় কাজের প্রমাণ, ফেসবুক পোস্টের সুন্দর কথামালার চেয়ে বেশি। এখানে আমার মনে হয় রাজনীতিবিদদের উচিত সত্যিকার অর্থে মাঠে সময় দেয়া। মানুষের কষ্টের কথা শোনা, তাদের পাশে থাকা। ফেসবুক পোস্ট এমনভাবে করা উচিত যাতে তা বাস্তবতার সাথে মিল রেখে হয়।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বললে, অনেক সময় দেখি যে রাজনীতিবিদদের ফেসবুক পোস্টগুলোতে যেটি দেখা যায় তা মাঠের বাস্তবতার সাথে খুব একটা মেলে না। এই ধরনের প্রচারণা হয়তো সাময়িক জনপ্রিয়তা এনে দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তেমন সাফল্য বয়ে আনে না। কারণ মানুষ প্রমাণ চান, কাজ দেখতে চান, এবং তারা চাইছেন তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান। ফেসবুক পোস্ট কেবলমাত্র একটি মাধ্যম হতে পারে যা মানুষকে জানাতে পারে কোন কাজ হয়েছে, কিন্তু কাজের সত্যিকারের চেহারা দেখাতে হলে মাঠে কাজ করতে হবে।

তাহলে আসলে প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতিবিদদের ফেসবুক পোস্ট কি স্রেফ একটি মুখরোচক গল্প? নাকি সত্যিকারের কাজের প্রতিফলন? আপনারা কী মনে করেন? মাঠের শূন্য ঘর যখন আমাদের সামনে বাস্তবতা হয়ে ধরা দেয়, তখন কি ফেসবুকের ঝলমলে পোস্টগুলো কেবলমাত্র প্রচারণার জন্যই নয়? আসলে এই দ্বন্দ্বের মুখোমুখি আমাদের হয়েই যেতে হয়। সুতরাং আসুন আমরা সবাই মিলে এই ফাঁকটা পূরণ করতে কাজ করি। আমাদের চাওয়া যে রাজনীতিবিদরা ফেসবুক পোস্টের চেয়ে মাঠের কাজকে গুরুত্ব দেন। প্রতিটি কাজের প্রতিফলন যেন মানুষের বাস্তব জীবনে পড়ে। তাহলেই আমরা সত্যিকারের পরিবর্তন দেখতে পাবো।