বছরের শেষ দিনগুলোতে যখন সবাই নতুন বছরের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, তখনও কিছু মানুষ আছে যারা নতুন বছরের আনন্দে শামিল হতে পারছে না। তারা হয়তো আমাদের চোখের সামনেই আছে, কিন্তু তাদের দুঃখ, তাদের কষ্টগুলো আমাদের চোখের আড়ালে। আজকের কথাগুলো সেইসব সংখ্যালঘু কিশোরদের নিয়ে, যারা বারবার প্রশ্ন করে, ‘এ দেশটা কি সত্যিই সবার?’

অনেকেই জানেন বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে সহাবস্থান করে আসছে। কিন্তু আমরা যখন একটু গভীরে যাই, তখন দেখি এই সহাবস্থান সবসময় সমতার ভিত্তিতে ঘটে না। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিশোরদের জীবনে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বৈষম্য, বঞ্চনা এবং তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে যদি আমরা কথা বলি, তবে অনেক অপ্রিয় সত্যই সামনে আসে।

প্রথমেই বলতে চাই সংখ্যালঘু কিশোরদের শিক্ষার অবস্থা নিয়ে। ২০২২ সালে করা এক গবেষণায় উঠে এসেছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুরা অনেকক্ষেত্রে শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত। বিশেষ করে গ্রামের দিকের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের বৈষম্য বেশি। শিক্ষকের পক্ষপাতিত্ব, অবহেলা, এমনকি সহপাঠীদের ঠাট্টা এসবই তাদের জন্য শিক্ষাপ্রাপ্তির পথে বড় বাধা। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন তারা প্রশ্ন করে, ‘এ দেশটা কি সত্যিই সবার?’ তখন সেই প্রশ্নের গভীরতা উপলব্ধি করাটা আমাদের দায়িত্ব।

শুধু শিক্ষা নয়, তাদের সামাজিক জীবনের অন্যান্য দিকেও বৈষম্য চোখে পড়ে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা যে কোনো সামাজিক কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণ কম হয়ে থাকে। অনেক কিশোরই জানায় যে তারা নিজেদের কষ্টকে মনের মাঝে চাপা দিয়ে রাখে, কারণ তাদের আশেপাশে শুনতে হয় এমন অনেক কথা, যা তাদের ভেতরের বিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয়। সামাজিক বন্ধন তৈরির অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের মানসিক বিকাশেও বড় প্রভাব ফেলে। কিন্তু কে শোনে তাদের কষ্টের কথা?

এই সমস্যা সমাধানে কি আমাদের কোনো উদ্যোগ নেয়া উচিত নয়? আমি মনে করি, এই কিশোরদের সমর্থন এবং সহযোগিতার জন্য আমাদের সবারই একসাথে কাজ করা উচিত। প্রথম ধাপটি হতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহনশীলতা এবং বৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সহযোগিতায় আমরা যদি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তবে এই কিশোরদের মনোবল অনেকটাই বেড়ে যাবে।

এছাড়াও, আমরা কি তাদেরকে শুধুমাত্র সংখ্যালঘু হিসেবে বিচার করতে পারি না? তারা আমাদেরই সন্তান, আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের প্রতিভা, তাদের সৃজনশীলতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সহানুভূতির চোখে দেখতে হবে। তাদের কষ্টের কথা শোনা এবং সমাধানের উপায় বের করা আমাদের দায়িত্ব।

বছরের শেষপ্রান্তে এসে যখন আমি এই লেখাটি লিখছি, তখন আমি ভাবছি, যদি ২০২৩-এ আমরা এই সমস্যাগুলোর দিকে একটু মনোযোগ দিই, তবে হয়তো সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, যখন আমাদের সব কিশোরই গর্ব করে বলতে পারবে, ‘হ্যাঁ, এই দেশটা আমাদের সবার।’ এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের দিতেই হবে, নয়তো সমাজে দিন দিন বিভেদ বাড়তেই থাকবে।

কিশোরদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের কাজই তাদের এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। সংখ্যালঘু কিশোরদের এই বঞ্চনা থেকে বের করে নিয়ে আসা, তাদের স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করা এবং তাদের প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন করা এসবই আমাদের আগামী দিনের পথে চলার বড় দায়িত্ব। আমরা কি এই দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত? আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি রেখে কি আমরা এগিয়ে যেতে পারবো? না কি সামান্য ভিন্নতার কারণে তাদের বঞ্চিত করবো? এই লেখাটি এখানেই শেষ করছি, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান আমাদের সবার জন্য অব্যাহত থাকা উচিত।

By nandini