জানুয়ারির শীতের সকালে খুব কমই আশা করা যায় যে এমন কোনো ঘটনা ঘটবে যা আমাদের সমাজের ভিত্তি নাড়িয়ে দেবে। কিন্তু, জানুয়ারি মাসের এক সকালে আমি একটি সংবাদ শুনলাম যা আমার মনকে অস্থির করে তুললো। সংবাদটি হলো কিছু হিন্দু–খ্রিস্টানদের দোকানে টার্গেটেড হামলা ও লুট। এই ধরনের ঘটনাগুলো নতুন নয়, কিন্তু প্রত্যেকবার যখন এমন কিছু ঘটে, তখন মনে হয় যেন এক নতুন আশঙ্কার ছায়া আমাদের সমাজের উপরে এসে পড়েছে।

আপনারা হয়তো ভাবছেন, কেন এমন ঘটনা ঘটে? কেন বাড়তে থাকে এর প্রকোপ? সাধারণত এগুলো ঘটে কোনো নিখুঁত পরিকল্পনা এবং সামাজিক বিদ্বেষের কারণে। একটা ছোট উদাহরণ দিলে বোধগম্য হবে। একবার দুর্গাপূজার সময়, আমাদের এলাকার মন্দিরে কিছু বহিরাগত এসে গণ্ডগোল শুরু করে। সে সময় কোনো বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, কিন্তু মানুষের মনে যে অনিশ্চয়তা এবং ভয়ের ছাপ পড়েছিল, তা বহুদিন ধরে কাটেনি। দোকানদারেরা ভয়ে দিনের বেলা দোকান খুলতেন, অথচ সন্ধ্যা নামলেই তারা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে বাড়ি ফিরে আসতেন। রাতের আঁধারে কেউ জানে না কখন আবার কিছু ঘটে যেতে পারে।

আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ অনেকসময় নিজেদের অনিরাপদ মনে করেন। এটা খুবই বেদনাদায়ক যে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারিনি যেখানে প্রত্যেক মানুষ নিরাপদে থাকতে পারে। আমরা সমাজের প্রতিটি স্তরে সংহতি এবং সহনশীলতার কথা বলি, কিন্তু বাস্তব জীবনে কতটা তা প্রয়োগ করতে পারি? মনে হয় যেন উন্নয়ন আর প্রগতির মাঝেও আমরা পিছিয়ে আছি।

এখন, এই হামলার বাস্তবতা নিয়ে যদি চিন্তা করি তাহলে দেখি যে হামলাগুলির পেছনে অনেকগুলি কারণ থাকতে পারে। এটা হতে পারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অথবা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। কিন্তু যাই হোক না কেন, এর একটা গভীর সামাজিক প্রভাব আছে যা আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। হামলাগুলি যখন বিশেষ কোনো ধর্মাবলম্বীদের উপর প্রতিক্রিয়া ফেলে, তখন পুরো সমাজে এক ধরনের ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়। এটা এমন এক চক্র যা আমাদের সমাজে ক্রমাগত অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলে রাখে। আর এই মুহূর্তে যদি আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে না পারি, তাহলে এটার প্রকোপ আরও বাড়তে থাকবে।

কিন্তু আমরা কি এই পরিস্থিতির জন্য কিছু করতে পারি না? অবশ্যই পারি। শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিলেই হবে না। এর জন্য আমাদের প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে সচেতন হতে হবে। আমাদের শিশুদের শিখাতে হবে যে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা যদি আমাদের প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে একটা সময় আসবে যখন এই ধরনের বিদ্বেষমূলক ঘটনা কমে আসবে। আমাদের সমাজে যেন কেউ অন্যের ধর্ম বা জাতের কারণে বৈষম্যের শিকার না হয়, তার জন্য আমাদের প্রতিটি স্তরে কাজ করতে হবে।

এখন মনে হতে পারে যে এগুলো বলাই সহজ, করা কঠিন। ঠিক আছে, তবে শুরুটা তো করতে হবে। কিছু ছোট ছোট পদক্ষেপই একটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যেমন, আপনারা যদি কোনো দোকানে যান এবং দেখেন যে সেখানে কেউ বিদ্বেষমূলক কিছু বলছে, তাহলে সেটা সরাসরি প্রতিবাদ করুন। যদি কোনো শিশু এমন ভুল ধারণা নিয়ে বড় হতে থাকে, তাহলে তার ভুলটি সংশোধন করুন। মনে রাখতে হবে, পরিবর্তন এক দিনে আসে না, কিন্তু একদিন তো আসবেই। আর সেই দিনটিকে আনতে হলে আমাদেরই কাজ করতে হবে।

এই ঘটনাগুলি আমাদের সামনে এক নতুন বাস্তবতা উদঘাটন করে যে আমাদের সমাজ এখনও কতটা পিছিয়ে আছে। আমরা যারা নিজেদের আধুনিক এবং প্রগতিশীল বলে দাবি করি, তারা কি আসলে নিজেদের সেই মানদণ্ডে পাল্লা দিতে পারি? আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত এবং সচেতন বলে মনে করি, তারা কি আমাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করি? এই প্রশ্নগুলো আমাদেরই নিজেদের করতে হবে, এবং এর উত্তরও খুঁজে বের করতে হবে।

শেষে একটা কথা না বললেই নয়, যদি আমরা সত্যি একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে আমাদের সকলকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এই সাহস দেখাতে হবে যে তারা একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারেন। একমাত্র এইভাবে আমরা এগিয়ে যেতে পারি এবং একদিন চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে পারি। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সেই দিনটির জন্য প্রস্তুত? সেই দিনটি কি আমরা দেখতে পাবো? নাকি সেই দিনটি শুধুমাত্র আমাদের কল্পনায়ই থেকে যাবে? এটি নির্ভর করছে আমাদের বর্তমান কাজের উপর।

By arjun