মার্চ মাসটা আমাদের কাছে একধরনের ক্যালেন্ডার হিসাবেই আসে, বিশেষ করে সেই মাসটি যখন আমরা স্বাধীনতা অর্জনের পথে প্রথম পা রাখি। কিন্তু ২০২৩-এর মার্চটা যেন কিছুটা ভিন্ন ছিল। এই মাসে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে নেতিবাচক স্মৃতির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। সেসব ঘটনা সরাসরি আঘাত করেছে আমাদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণাকে যা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। হ্যাঁ, আমি কথা বলছি মার্চ মাসজুড়ে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট হামলাগুলোর, যা চার্চ, বিহার এবং মন্দিরের মতো পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে ঘটেছে। এই হামলাগুলো সত্যিই আমাদের চিন্তায় ফেলেছে কি হচ্ছে আমাদের সমাজে, কেন এমন হচ্ছে?
প্রথমেই বলি, আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সারা বছরই একধরনের সুরক্ষা পায়। তবে মার্চের তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো সেই সুরক্ষা ব্যবস্থার গলদগুলোকে প্রস্তাবিত করেছে। বিভিন্ন স্থানে হামলা হয়েছে, কখনও তেমন গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়নি, তবে তার প্রভাব ছিল মনস্তাত্ত্বিক। আমরা জানি, ছোট ছোট শিশুরা মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করে, চার্চে শান্তিতে বসে থাকে, বিহারের পরিবেশে ধ্যান করে। কিন্তু যখন এমন হামলার খবর শুনতে হয়, আমরা কি সত্যিই সেই শান্তির অভিজ্ঞতা দিতে পারি তাদের?
বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, এই হামলাগুলোর পেছনে কোনো বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা ধর্মীয় বিদ্বেষ নেই, তথাপি এদের প্রভাব কিন্তু ছোট নয়। স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী এমনকি কখনও কখনও ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে এমন কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আমরা এমন মনোভাব নিয়ে চলছি? আমাদের মধ্যে এই অসহনশীলতা বা অসহিষ্ণুতা কেন গড়ে উঠছে? আমি মনে করি, শিক্ষার অভাব, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সামাজিক সংযোগের অভাব এর মূল কারণ।
আমাদের সমাজে, প্রত্যেক ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করে। আমাদের স্কুলের ক্লাসরুমে, আমাদের কর্মস্থলে, এমনকি আমাদের প্রতিবেশীতেও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা আছে। এই মিলিত সমাজের সৌন্দর্য আমাদের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু এই ছোট ছোট হামলাগুলো সেই সৌন্দর্যের ওপর কালো ছায়া ফেলেছে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে আমরা কি শিক্ষা দিচ্ছি? সহিংসতা নয়, বরং সহাবস্থান আমাদের শিক্ষা হওয়া উচিত।
কিছুদিন আগে আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি ছোট চার্চে গিয়েছিলাম। সেই সময়ে স্থানীয় একজন বৃদ্ধার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তিনি বলছিলেন, আমরা তো এমন সময় দেখিনি, যখন আমাদের প্রার্থনার স্থানেও নিরাপত্তাহীনতা বোধ করতে হয়। এই কথাগুলো শুনে আমার হৃদয়ে একধরনের কষ্ট অনুভব হয়েছিল। এটা কেমন করে সম্ভব যে আমাদের দেশ, যা এতগুলো ধর্মীয় সংস্কৃতির লালন করে, সেখানে এমন ঘটনা ঘটা শুরু করল?
আমাদের শিখতে হবে সহাবস্থানের মর্ম। তবে এই সহাবস্থান কি শুধু মুখের কথা হতে পারে? না, এটা হতে হবে কাজের মাধ্যমে প্রদর্শন করা। যদি আমরা অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করি না, তবে কিভাবে আমরা নিজেদের ধর্মকে সম্মান জানাবো? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা সৃষ্টির জন্য আমাদের শৈশব থেকেই বাচ্চাদের এই শিক্ষা দিতে হবে।
বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় যে এই ধরনের ঘটনা বাড়ে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা। এদের উদ্দেশ্য হয় পরিস্থিতিকে উত্তেজিত করা, মানুষকে বিভাজিত করা। কিন্তু আমরা কি সত্যিই তাদের এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে দেবো? আমার মতে, বাংলাদেশের মতো একটি অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল দেশে ঐক্যবদ্ধ থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ আমরা যদি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাই, তবে কেউ আমাদের উন্নয়নকে থামাতে পারবে না। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত ঐক্যবদ্ধভাবে এই প্রকার উগ্রবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমাদের সমাজে যতই নানান রকম মতভেদ থাকুক না কেন, আমাদের উচিত সৌহার্দ্যের পথে হাঁটা। আমার মনে হয়, আমরা যদি নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করি আপনাকে জানতে চাই, আপনার মতামত কি, আমার মতামত কি তাহলে এই পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে।
এই প্রসঙ্গে আমি সরকারের দিকেও একটি আবেদন রাখতে চাই। আমাদের উচিত এই সমস্ত পবিত্র স্থানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা। স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের মধ্যে আরো সমন্বয়ের প্রয়োজন যেখানে সামাজিক সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
সর্বোপরি, আমার মনে হয়, আমাদের প্রত্যেকের উচিত আমাদের হৃদয়ের দরজা খোলা রাখা, যেখানে ভালোবাসা, সম্মান এবং সহানুভূতির স্থান থাকবে অন্যদের জন্য। যদি আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি তবে আমাদের সমাজে আর কখনও এমন ঘটনা ঘটবে না। আমরা সবাই একসাথে সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনের পথে অগ্রসর হতে পারবো।
তাহলে আপনি কী মনে করেন? এই ছোট ছোট হামলাগুলো কি আমাদের সাহচর্যের পথে বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে না? আমরা কি আমাদের সন্তানদের সেই সুন্দর সমাজ দিতে পারবো যেখানে সবাই নিজেদের ধর্মবিশ্বাসে আস্থাশীল হতে পারবে? আমি আশা করি, আমরা সবাই একদিন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাবো এবং সঠিক পথে এগিয়ে যাবো।
