বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের প্রথম দিকটা যেন একেবারে নতুন এক সংঘাতমুখী সময়ের সূচনা করেছে। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় অস্বীকার বনাম আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। আমাদের নিজেদের দেশ বাংলাদেশ থেকেও দেখা যায়, কীভাবে এ ধরনের সংঘর্ষমূলক বয়ান কখনো স্থানীয় সমস্যাকে জটিল করে তোলে, আবার কখনো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে।

আচ্ছা, চা হাতে বসে একটু ভাবি। আমাদের অনেকের, বিশেষ করে যারা রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন, তারা অবশ্যই লক্ষ্য করবেন যে প্রায়শই সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে বিবাদ লেগেই থাকে। যেমন ধরুন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে কত আলোচনাই না হয়েছে, কিন্তু ক’জনই বা তা মানতে আগ্রহী? বিশেষ করে বড় বড় শক্তিশালী দেশগুলো। তারা নিজেদের মুনাফা বাড়াতে গিয়ে যেন এক প্রকার অন্ধ হয়ে পড়েছে। আর এদিকে, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা পরিণামে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগের তালিকায় উঠে এসেছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ও। বেশ কিছু বছর ধরেই বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন দেশের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে সেই উদ্বেগকে বরাবরই অস্বীকার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু কিছু দেশে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন এবং গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া সত্ত্বেও তারা অবস্থান ধরে রাখতে ব্যস্ত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বললে, রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ অনেক সময় সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া, বাক স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের মুক্তি নিয়ে উদ্বেগ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এগুলোকে অস্বীকার করে অনেকেই বলেন, ‘এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। আসলে কি তাই?

এই বয়ান সংঘাতের পেছনে আমাদের সচেতনতার অভাবও রয়েছে। অনেক সময় আমরা নিজেরাই জানি না বাস্তব ঘটনা কী। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যখন কোনো বিবৃতি দেয়, তখন তা নিয়ে আমরা কীভাবে বিশ্লেষণ করবো সেটা না জানার ফলে এই সমস্যা আরো বৃদ্ধি পায়। একটা সাধারণ উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে বেশি সহজ হবে। ধরুন, আমরা যদি জানতাম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কোনো খবর প্রকাশ হলে এর পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে, তাহলে হয়তবা আমরা নিজেরাই আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের সামাজিক মিডিয়ার যুগে অনেক সময় ভুল তথ্যের স্রোতে ভেসে যায় সত্য।

এখন আসি ভবিষ্যতের দিকে। কী করা যায় এ ধরনের সংঘাত থেকে মুক্তি পেতে? প্রথমত, আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ শুধুমাত্র তাদের উদ্বেগ নয়, বরং এর পেছনে থাকা সমস্যাগুলো আমাদেরও সমস্যা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সিদ্ধান্তগুলোকে স্বচ্ছ রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, আমাদের নাগরিকদের উচিত হবে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন এবং প্রতিবাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করা, যাতে আমাদের নিজস্ব সমস্যাগুলোও বিশ্বব্যাপী সচেতনতার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

সবশেষে, পাঠকদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন: রাষ্ট্রীয় অস্বীকারের এ ধরনের বয়ান সংঘাতে আমরা নিজেরাই কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমরা কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি, নাকি অজ্ঞতার মোহনায় ভেসে যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হয়তো অনেকেরই নতুন করে ভাবতে হবে। হয়তো আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস এবং মনোভাবকে আবারও যাচাই করতে হবে। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে উন্নত জাতি হতে চাই, তবে আমাদের এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কারণ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

By bithika