শিরোনামটা পড়েই মনে হয়, “ভূমি দখল–সংক্রান্ত মামলা বেড়েছে, কিন্তু দোষী দমনে কোনো অগ্রগতি নেই,” কে যেন একটা চুপিসারে গোপন সত্যি ফাঁস করে দিল। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে ভূমি দখলের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত, যেমনটা আমরা আপেল গাছের নিচে দাঁড়ালে আপেল মাথায় পড়ে, তেমনই এই দেশেও ভূমি দখলের মামলা বাড়ে, কিন্তু দোষীরা ঠিকই রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই সমস্যার সাথে আমাদের পরিচয় হওয়া ঠিক কবে থেকে শুরু হলো, আমরা কেউই নির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না। তবে একথা নিশ্চিত যে, সময়ের সাথে সাথে এই সমস্যা যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
আমাদের দেশের মানুষের সাথে ভূমি আর মাটি যেন মনের গভীরের সম্পর্ক। আপনাদের মনে থাকতে পারে সেই ছোটবেলার গ্রীষ্মের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যেয়ে কাটানো দিনগুলো, যখন মাটির উঠোনে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করতাম। সেই সম্পর্ক যেন আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই ভালোবাসা যখন লোভের রূপ নেয়, তখনই ঘটে বিপত্তি। এবং সেই ঘটনা ঘটে অনেক বেশি, যখন দখলের মতন ব্যাপারগুলো সামনে আসে।
বাংলাদেশে ভূমি দখলের মামলা দিনের পর দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, গত পাঁচ বছরে এই ধরনের মামলাগুলোর সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে। আর এই বাড়তি মামলার চাইতে বেশি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দোষীরা ঠিকই সগর্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে ক’টা নামকরা মামলা আছে, তার উদাহরণ দিতে গেলে তালিকাটা বেশ দীর্ঘ হবে। তবে এতে তো প্রমাণ হয়ে যায় না যে, দোষীরা আসলে ধরা পড়ছে বা শাস্তি পাচ্ছে। অবস্থাটা অনেকটা এমন যে, আমরা একপাশ থেকে বালির ঘর গড়ছি, আর অন্যপাশ থেকে অদৃশ্য কোনো হাত তাড়াহুড়ো করে সেই ঘর ভেঙে ফেলছে।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? ভূমি দখল সংক্রান্ত মামলাগুলোতে প্রকৃত অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে। প্রথমত, দেশের বিচার ব্যবস্থায় অনেক দেরি হয়। আমাদের দেশে একটি মামলার নিষ্পত্তিতে যে সময় লাগে, তাতে অপেক্ষারত ব্যক্তির চুল পেকে যেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রেই বিচার পাওয়া মানে জীবনের একটা বড় সময় পেরিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, ভূমি দখলের সাথে জড়িত বড় বড় প্রভাবশালী মানুষগুলো। এরা কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো ব্যবসায়ী, আবার কখনো স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। এদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির কারণে সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না।
এই সমস্যার সমাধান করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে? আমার মতে, এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের সঠিক প্রয়োগ। আমাদের দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে পারে। এছাড়া, সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। ভূমি দখল কেবল একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির পথে বড় বাধা। ভূমি দখল বন্ধ হলে কেবলমাত্র পুঞ্জীভূত সম্পদ ও অর্থের ন্যায্য বন্টনই নিশ্চিত হবে না, সামাজিক শান্তিও প্রতিষ্ঠিত হবে।
এখন, আপনারা হয়তো ভাবছেন, এই লেখাটা পড়ে কি কোন পরিবর্তন আসবে? হতে পারে আসবে, হতে পারে আসবে না। কিন্তু আমরা যদি একটি সুন্দর আগামী চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের সজাগ হতে হবে। কারণ, এই সমস্যাগুলো শুধু আজকের জন্য নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর যদি আমরা এখনই কিছু না করি, তাহলে হয়তো একদিন দেখবো, আমাদের নিজেদের জমিতে আমাদেরই কেনা বেচার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে সচেতন হই, এবং সেই সচেতনতা থেকে শুরু করি এই সমস্যার সমাধানের পথে যাত্রা। সমাজের প্রত্যেকটি স্তরে যদি পরিবর্তন আনা যায়, তবে নিশ্চয়ই একদিন আমাদের দেশ ভূমি দখলের এই কালো ছায়া থেকে মুক্তি পাবে। আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?
