জমি রক্ষা করতে গিয়ে হামলা–মামলা–হুমকি: এক কৃষকের বছরের মাঝামাঝি দৌড়ঝাঁপ

আমাদের দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের জীবনমান উন্নতির পথ যেন সবসময়ই কন্টকাকীর্ণ। আর তার চেয়েও বড় দুঃখের বিষয় হলো, যখন তাদের জমি রক্ষা করতে গিয়ে নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। হয়তো আপনি বা আপনার কেউ এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন কিংবা শুনেছেন যে, জমি-সংক্রান্ত বিরোধে একজন কৃষককে কতশত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। আজকের এই লেখাটা সেই সব কৃষকদের জন্য, যারা তাদের জমি রক্ষা করতে গিয়ে বছরের মাঝামাঝি দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

একজন কৃষকের জন্য জমি মানেই জীবন। আমাদের দেশে কৃষি এখনো একটি প্রাধান্য পাওয়া পেশা। আর ভাবতে অবাক লাগে, যেখানে এই পেশার উপর নির্ভর করে দেশের শতকরা বিশ ভাগেরও বেশি মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়, সেখানে তাদের জমির সুরক্ষায় এত বাধা কেন? চলুন, একটু খোলসা করি।

মনে করুন একজন কৃষক তার নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে সংসার চালায়। এই জমি তার বাবার, দাদার সময় থেকে অতিক্রান্ত। কিন্তু হঠাৎ একদিন কেউ এসে দাবি করলো, এই জমি তার। তাহলে সেই কৃষকের কেমন লাগবে? তার মনে হবে পৃথিবী যেন উলটে গেছে। আর এ যেন কোনো কল্পকাহিনী নয়, বাস্তবে এমন ঘটনার সাক্ষী আমরা অনেকে। জমি নিয়ে বিরোধ, কাগজপত্রের দুর্বলতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হুমকি এই সবই একজন সাধারণ কৃষকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

যখন কেউ কৃষকের জমি দাবি করে, তখন কৃষককে বাধ্য হয়ে আইনের আশ্রয় নিতে হয়। আর সেখানেই শুরু হয় তার দৌড়ঝাঁপ। মামলার ব্যাপারটি সহজ নয়। সেটা ফাইল করা থেকে শুরু করে আদালতের প্রতিটি শুনানিতে হাজির হওয়া এসবই তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বিষয়টি শুধু আইনি পর্যায়ে থেমে থাকে না। বিশেষ করে যদি সেই কৃষকের প্রতিপক্ষ প্রভাবশালী কেউ হয়, তবে শুরু হয় নতুন এক যুদ্ধ। কারণ, সেই কৃষককে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হতে পারে। অনেক সময় এমনও হয়, যে তার ফসল নষ্ট করে দেওয়া হয় অথবা জমিতে গিয়ে বিভিন্ন রকমের ক্ষতি করা হয়।

এই অবস্থায় একজন কৃষকের জন্য জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। আমাদের দেশের সিস্টেম অনুযায়ী, মামলার নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লেগে যায়। আর সেই সময় পর্যন্ত কৃষককে নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয়। অথচ, তার জীবিকার মাধ্যম সেই জমি যা বাঁচিয়ে রাখতে তার প্রয়োজনীয় সব চেষ্টাই ব্যর্থ হতে পারে যদি আইন তার পক্ষে না থাকে।

많া মানুষ মনে করে, এই সমস্যার সমাধান সহজ। কাগজপত্র সঠিক থাকলেই তো হয়। কিন্তু আমাদের দেশের জমির দলিল-পত্রের জটিলতা এতটাই বেশি যে, সাধারণ কৃষকের পক্ষে সে সব বিষয় বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে অনেক সময় তারা প্রতারণার শিকার হন। এমনও ঘটনা ঘটে, যেখানে তারা ভুয়া দলিলের কারণে তাদের জমি হারান। আর তখনই সেই অসহায় কৃষকের দৌড়ঝাঁপের শুরু হয়।

আমি মনে করি, এই সমস্যার সমাধানে আমাদের সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কার্যকরী হতে হবে। জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধান করার জন্য একটি কার্যকরী ব্যবস্থা থাকা উচিত। জমির কাগজপত্রের জটিলতা দূর করতে ডিজিটালাইজেশন কার্যকর হতে পারে। আমাদের দেশের কৃষকদের জন্য আরও সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া উচিত, যাতে তারা জমি নিয়ে প্রতারণা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।

আমার এ লেখাটির মাধ্যমে আমি শুধুমাত্র সমস্যার চিত্রটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাদের সবার। আমরা কি কখনও ভেবে দেখি, যারা দিনের পর দিন আমাদের খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন করে, তাদের জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলো আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি? একজন কৃষকের জমি রক্ষা করতে গিয়ে যদি বছরের মধ্যভাগেই দৌড়াতে হয়, তাহলে আমাদের উন্নতির পথে আর কতটা এগিয়ে চলেছি আমরা?

আসুন, সবাই মিলে একসাথে কাজ করি। যে কৃষক আমাদের সুখী রাখছেন, তার জন্যই আমাদের কিছু করতে হবে। তাকে ভরসা দিতে হবে যে, তার জমি তারই থাকবে, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির নয়। আমাদের শেষ প্রশ্নটা থাকুক এইভাবে: আপনার মতে, কীভাবে আমরা আমাদের দেশের কৃষকদের জমির সুরক্ষায় সাহায্য করতে পারি? সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই। আর তা না হলে, আমরা হয়তো একদিন এমন এক দেশের বাসিন্দা হবো, যেখানে আর কোনো কৃষক থাকবে না।

By hritik