একটি ভোর-ভাঙা সকাল। রোগা-পটকা, ধুলোতে ভরা একটা বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। গন্তব্য বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা। বেশ কিছুদিন ধরে মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল ঈশ্বরদী থেকে হিলি সীমান্তে কেন এত মানুষ অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে? সীমান্তের ওপারে কি এমন মহাযজ্ঞ চলে যে নিজের দেশ ছেড়ে সেখানে যেতে এত্ত অনুপ্রাণিত হয় মানুষগুলো?
এই ভাবনাগুলো মাথায় নিয়ে আমি ওই সীমান্ত এলাকার দিকে পা বাড়াই। একটু দ্বিধার সাথে, একটু দুঃসাহসিত ভঙ্গিতে। আমাদের দেশের সীমান্তগুলোর অবস্থান বেশ জরাজীর্ণ। আমাদের সীমান্ত বিজিবি (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) তাদের সাধ্যানুযায়ী নজরদারি চালায়। তবে পরিস্থিতির বাস্তবতা অনেকটা আলাদা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের দিকে, প্রবেশের চেষ্টা করে। কে এই মানুষগুলো? তারা কি শুধুই ভাগ্য পরিবর্তনের ধান্দায়, নাকি তাদের পেছনে অভিবাসনের চেয়ে বড় কোনো কারণ কাজ করছে?
আমাদের দেশ একটু ভিন্ন। এখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাঁদের অধিকারের দাবিতে প্রায়ই নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। সবসময় নয়, তবে মাঝে-মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা আমাদের সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার সাহস করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গমন কি তাঁদের দূর্ভাবনার অবসান ঘটায়? নাকি অন্য কোনো দুঃস্বপ্নের পথে তাঁদের নিয়ে যায়?
ভারতে অনেক সংখ্যালঘু অভিবাসী তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের নতুন পরিচয় ‘অবৈধ অভিবাসী’। সেখানে তারা নতুন এক জর্জরিত জীবনের সম্মুখীন হন যেখানে তাদের প্রতিনিয়ত নিজেদের পরিচয়ে নিরাপদ থাকার লড়াই করতে হয়। অবৈধ অভিবাসীর তকমা বহন করে চলা যেন তাদের জন্য এক দীর্ঘদিনের নিত্যকার বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।
আমি সেই সীমান্ত এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সাথে কথা বলি। তাদের মধ্যে একজন, নাম সুশান্ত, বললেন, আমরা এখানে থাকি, কিন্তু আমাদের জায়গা নেই। যেতে চাইলে কেউ আমাদের জায়গা দেয় না, কাগজ দেয় না। আর ফিরে আসলে নিজের দেশও যেন আমাদের না চিনে। আমরা কোথায় যাব? সুশান্তের কথা শুনে এক ধরণের নিস্তব্ধতা আমার মধ্যে ভর করে। আমি বুঝতে পারি, তাদের এই প্রশ্নের উত্তর সত্যিই কাউর কাছে নেই।
মূলত যারা এই অনুপ্রবেশের পথ বেছে নেয়, তাদের বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকাগুলোর মানুষ। তারা নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে, আর্থিক অনিশ্চয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ভারতে গিয়ে তারা সেখানে কাজের খোঁজে থাকেন, কিন্তু তাদের প্রতিদিনের জীবন যেন একটি ঝুঁকিপূর্ণ খেলার মতো হয়ে দাঁড়ায়। তাদের কাছে নেই কোনো বৈধ পরিচয়পত্র, নেই কোনো সামাজিক অধিকার। এই অবস্থায় তাদের জন্য জীবন যাপন করা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং।
আমাদের নিজেদের দেশে ফিরে আসলে তারা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হন। সেখানে তাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাদের অনুভূতিগুলোকে অবহেলা করা হয়। এই অবস্থায় তাদের জীবন যেন এক ধরণের সংকটময় বৃত্তের মধ্যে পড়ে যায়। এই বৃত্ত থেকে বের হতে না পেরে তারা এক ধরনের ভীষণ মানসিক চাপে ভুগতে থাকে।
আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে আমাদের দরকার একটি সঠিক সমাধান। শুধু সীমান্তে কঠোরতা নয়, বরং অভ্যন্তরীণভাবে এসব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ে কোনো বৈষম্য যেন না ঘটে, সেই বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, এবং বৈষম্যের মতো সমস্যাগুলোকে সমাধান করে যেন আমরা এ ধরণের অনুপ্রবেশের প্রয়োজনীয়তা কমাতে পারি।
অবশ্যই আমাদের সরকারের দায়িত্ব রয়েছে এসব সমস্যার সমাধান করা। তবে আমাদের সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে। আমাদের উচিত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদেরকে আমাদের সমাজের একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।
প্রতিদিন সীমান্তে যে চিত্রগুলো আমরা দেখি, তা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমাদের ভাবনার জগতে এই বিষয়গুলোকে তুলে নেয়ার সময় হয়েছে। যদি আমরা এভাবে চলতে থাকি, তাহলে একদিন আমাদের দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। আমার মনে হয়, সময় এসেছে আমাদের নিজেদের সমাজের জন্য সচেতন করার। আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই হয়তো একদিন বৃহৎ পরিবর্তনের সূচনা করবে।
তাই আপনার মতে, সত্যিই কি আমরা আমাদের দায়িত্ব ঠিকমত পালন করছি? আমাদের সীমান্তে যে আগন্তুকরা আসেন, তাদের জন্য কি আমরা কোনো সুদূরপ্রসারী সমাধান দিতে পারি না? আমাদের সমাজ কি সত্যিই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত? আমরা কি আমাদের দেশের জনগণের জন্য একটি নিরাপদ এবং সহনশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াটা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
