খবরের কাগজ খুললেই এখন সহিংসতার খবর চোখে পড়ে। কিন্তু যখন সেই সহিংসতার শিকার হয় সমাজের সংখ্যালঘু অংশ, তখন বিষয়টা আরও ভয়াবহ হয়ে যায়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ঘটেছে এমন ৩০২টি সহিংসতার ঘটনা, যা মূলত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে। এমন একটা তথ্য আমাদের ভাবায়, আমাদের হৃদয়ে একধরনের কষ্ট এনে দেয়। কিন্তু কেন এমনটা ঘটছে বারবার? এর পিছনে কি লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের কিছু গভীর সংকট?
আমরা বলি, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। আমাদের সংবিধানেও তা উল্লেখ আছে। কিন্তু বাস্তবে সেই অসাম্প্রদায়িকতার চিত্র কি আমরা দেখতে পাচ্ছি? ২০২৩ সালে ঘটে যাওয়া এই সহিংসতার ঘটনাগুলো কিন্তু বলে দিচ্ছে ভিন্ন কথা। এই ঘটনাগুলো আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয় যে, অসাম্প্রদায়িকতার পথে হাঁটার জন্য আমাদের সমাজে আরও অনেক কাজ বাকি আছে।
আমার এক বন্ধুকে নিয়ে বলি। শ্রীধর নাম, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। আমরা একসাথে বড় হয়েছি, খেলেছি, একই স্কুলে পড়াশোনা করেছি। শ্রীধর সবসময়ই বলে আসছে যে, তার পরিবার অনেকটা আতঙ্কের মাঝে বাস করে। সে বলে, “ভাই, একটা ভয় কাজ করে মনে। কখন জানি কি হয়।” শ্রীধরের মতো আরও কত শত পরিবার এমন আতঙ্কের মাঝে বাস করছে, সেটা ভাবলে বুকটা মোচড় দেয়।
কিন্তু কেন এই সহিংসতা? প্রশ্নটা আমি নিজেকে বারবার করি। উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখি, এর পিছনে কাজ করছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিভিন্ন কারণ। রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করা হয় একটি চাপের হাতিয়ার হিসেবে। আবার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলতাও অনেক সময় সহিংসতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের উচ্চবিত্তরা অনেক সময় তাদের স্বার্থ রক্ষায় সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না। তবে সবথেকে ভয়াবহ হলো, সামাজিকভাবে আমাদের মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা বেড়ে চলেছে, তা।
এই অসহিষ্ণুতা মূলত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক মূল্যবোধ, এবং সংস্কৃতি থেকে উত্পন্ন হচ্ছে। আমরা মনে হয় ভুলে গেছি, ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াটাই আমাদের মানবিকতার প্রকৃত প্রকাশ। আমাদের সমাজে এখনও একটা বড় অংশ আছে, যারা ভিন্নমত শ্রদ্ধা করতে শিখেনি। এর ফলে সহিংসতার জন্ম।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটে। অনেক সময় দেখা যায়, হিন্দু পরিবারগুলোর জমি জবরদখলের চেষ্টা চলে। এতে স্থানীয় প্রশাসনও অনেক সময় নির্বাক থাকে, কারণ তারা বলে, “এটা আমাদের সমস্যা না।” কিন্তু এটা তো সমস্যা। আমরা যদি একসাথে বাস করতে চাই, তাহলে প্রত্যেকের সমস্যাই আমাদের সমস্যা।
এই সহিংসতার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের দেশের ইমেজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দাতা সংস্থাগুলোও অনেক সময় এই বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকে। তারা বলছে, অসাম্প্রদায়িকতার পথে হাঁটতে হলে এই ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতেই হবে।
সমস্যা সমাধানের পথে আমাদের অনেক কিছু করতে হবে। প্রথমত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি। শিশুদের ছোট বেলা থেকেই ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা জাগানো প্রয়োজন। তাদের শেখাতে হবে, “সব ধর্মের মানুষই সমান।” পরিবারে শিশুদের মধ্যে এই মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। স্কুলেও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিকভাবে কঠোর হতে হবে। প্রতিটি সহিংসতার ঘটনা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে। প্রশাসনকে বুঝতে হবে যে, এই ধরনের ঘটনাগুলো তাদের ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে।
তৃতীয়ত, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও সচেষ্ট হতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থে সংখ্যালঘুদের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তাদের উচিত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসা।
চতুর্থত, আমাদের মিডিয়াকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা এই ঘটনাগুলো নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারে। ঠিক যেমনটি বর্তমানে কিছু মিডিয়া করছে। তবে আরও জোরালোভাবে এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে যে, সহিংসতার কোনো ধর্ম নেই।
শেষ পর্যন্ত, আমরা সবাই যদি একযোগে কাজ করি, তাহলে এই সহিংসতার ঘটনার সংখ্যা কমে আসবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ আমাদের সবার। এখানে কোনো ধর্ম, বর্ণের ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। আর যদি আমরা এটা বুঝতে না পারি, তাহলে আমাদের অসাম্প্রদায়িকতার স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।
একটি প্রশ্ন রেখে শেষ করি: আমরা কি সত্যিই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবো? নাকি আমরা শুধু কথায় কথায় অসাম্প্রদায়িকতা বলে মুখ রক্ষা করবো? এখনই সময় আমাদের ভেবে দেখার, এবং সেইমতো কাজ করার। আমাদের হাতেই আমাদের দেশের ভবিষ্যত।
