নির্বাচনের পরদিন ভাঙা মন্দির, পোড়া দোকান: ভোটের রায় শুনালো সংখ্যালঘুপাড়ায় আগুনে লেখা বার্তা
সময়টা জানুয়ারি ২০২৪। আরেকটি নির্বাচন শেষ হলো। তবে এবার নির্বাচন পরবর্তী দিনটিতে বাংলাদেশে যা ঘটলো, তা বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কেন এমন হলো? কীভাবে এমন হলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে হয়তো আমরা একটা স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু তার আগে চলুন একটু তলিয়ে দেখি আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এই পর্বটি।
নির্বাচনের ফলাফলে যেসব এলাকা বিশেষভাবে আলোচিত হলো, সেগুলোর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এলাকায় এই বার্তা যে, ভোট দেবার অধিকার সবার আছে, কিন্তু তার মূল্য দিতে গিয়ে যদি ঘরবাড়ি, মন্দির বা দোকান হারাতে হয়, তবে সেটা আমাদের গণতন্ত্রকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমার মনে পড়ে যায় আমাদের দেশের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার কথা, যেখানে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা এবং আতঙ্ক ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এবার যেন সেই আতঙ্ক একদম বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
ভাঙা মন্দির এবং পোড়া দোকানের খবর যে শুধুমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করছে, তা নয়। এটি একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। যখন নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তা আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থার প্রতিফলন বলে ধরে নিতে হয়। আমরা কি সত্যিই একে আরেকটির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারি? আমাদের কি উচিত নয়, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে সবাই তাদের মত প্রকাশ করতে পারে, নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে, এবং নিজেদের জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে?
এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। হয়তো আমরা নিজেরাই জানি না আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কোথায় সীমাবদ্ধ। হয়তো আমরা ভাবি আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত, কিন্তু বাস্তবে তা হয়তো এতটা শক্তপোক্ত নয়। এই বাস্তবতা আমাদের বুঝতে হবে, যদি আমরা সত্যি সত্যি একটি উন্নত দেশ হিসেবে নিজেদের পরিচিত করাতে চাই।
কিন্তু এখানে একটা ব্যাপার অবশ্যই বলা দরকার। আমাদের দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই অনেক উন্নত হয়েছে, অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভোটারদের সচেতনতা বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তারপরও কেন আমরা এমন সহিংসতার সম্মুখীন হতে হয়? এর জন্য কি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দোষারোপ করা যায়? না কি আমাদের সামগ্রিক সমাজব্যবস্থার মধ্যে কোথাও ফাটল আছে, যেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না?
আমাদের রাজনৈতিক নেতারা কি সত্যিই চান এই সমস্যা সমাধান করতে? না কি তারা শুধু নিজেদের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে চান? যদি সেই নেতাদেরই আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য ভোট দিই, যাদের কারণে আমাদের ঘরবাড়ি হারাতে হয়, তবে তো এই গণতন্ত্র শুধু নামেই গণতন্ত্র হয়ে থাকে। এটা হতে পারে না, এটা মানা যায় না।
তাহলে আমরা করব কী? প্রথমত, আমাদের দরকার সচেতনতা বৃদ্ধি। আমাদের দরকার সামাজিক সংহতি এবং সম্প্রীতির সংস্কৃতি তৈরি করা। আমাদের দরকার একটি এমন সমাজ যেখানে সকল ধর্ম, সম্প্রদায় এবং পেশার মানুষ সমান মর্যাদা পায়। আমাদের দরকার এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ যেখানে প্রতিটি ভোটের মূল্য আছে, এবং প্রতিটি নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে।
কিন্তু কেবলমাত্র সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করলেই হবে না। এর জন্য আমাদের রাজনৈতিক নেতাদেরও মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তাদের আমাদের মত মানুষের জন্য কাজ করতে হবে, তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান বের করতে হবে।
যদি আমরা এই সমস্যাগুলোর সমাধান না করতে পারি, তবে হয়তো এমন একটা দিন আসবে যখন আমরা নিজেরাই নিজেদের গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করবো। হয়তো এমন একটা দিন আসবে যখন আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়বে। আর সেই দিনটা আসার আগেই আমাদের উচিত নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান বের করা।
তাহলে আসুন, আমরা সবাই মিলে কাজ করি। আমরা আমাদের গণতন্ত্রের মজবুত ভিত্তি গড়ি। আমরা একটি এমন দেশ গড়ি যেখানে নির্বাচন পরবর্তী দিনটি ভাঙা মন্দির আর পোড়া দোকানের বার্তা নয়, বরং একটি নতুন ভোরের সূচনা। আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদের হাতেই। আমরা কি সেই ভবিষ্যৎ তৈরি করতে রাজি আছি?
