নির্বাচনী পরবর্তী সময়ে মামলা এবং হামলা এই দুটি শব্দ শুনলেই আমাদের মনে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। যেন, কোথাও কোন অশান্তির আগমন ঘটতে চলেছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা যেন একটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা নির্বাচনে পরাজিত হয় তাদের অনেকের মনোভাব থাকে প্রতিশোধমূলক। এ অবস্থায় সংখ্যালঘুদের কি সঠিক বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকে? প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি।
গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে হামলা, নির্যাতন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব মামলায় অভিযুক্তরা সাধারণত সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষেরা। কিন্তু প্রশ্ন হল, এমন মামলাগুলোতে কি আদৌ নিরপেক্ষ তদন্ত হয়? ঐতিহাসিকভাবে আমরা এসব মামলায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ দেখেছি। বিচার প্রক্রিয়ার সঠিকতার প্রশ্নে বারংবার প্রশ্ন উঠে আসে। এইসব হামলার ঘটনার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা লুকিয়ে থাকে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে যে, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হয়েছিল। তেমনিভাবে, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে, আসলে আমরা কি সত্যিই স্বাধীন দেশে থাকতে পারছি? এসব ঘটনার পেছনে কি কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে, নাকি শুধুই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ?
নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনায় অনেক সময় প্রশাসন নীরব থাকে। তাদের ভূমিকা অনেক সময় পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হয়, যা প্রভাব ফেলে তদন্ত প্রক্রিয়ায়। বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষপাতী থাকে বলে অভিযোগ আসে। এ কারণে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিরপেক্ষ তদন্ত চালাতে ব্যর্থ হয়, তবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এই ধরনের ঘটনা বিচার প্রক্রিয়ার উপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। এমনকি বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই প্রভাবিত হয়ে পড়েন, যা বিচার প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে অকেজো করে তুলছে। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের উপর হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও, সামাজিক দায়িত্ববোধের অভাবও কারণ হিসেবে কাজ করে। আমাদের সমাজের বড় একটি অংশ এখনও সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে বের হতে পারেনি। যার ফলশ্রুতিতে নির্বাচনের পর এমন হামলা ঘটে। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বিষয় দেখা। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে সংখ্যালঘু–সংখ্যাগুরুর বিভেদ বাড়িয়ে তুলি, তাহলে সমাজে শান্তি আসবে কীভাবে?
আমরা কি পারি না, এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে যেখানে সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষ এক সাথে মিলেমিশে থাকতে পারবে? যেখানে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হবে না, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমরা কি পারি না, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে সকলের জন্য এক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে? এই প্রশ্নগুলো আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে ভাবাতে হবে, বিশেষ করে যারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার বিভাগের সাথে জড়িত। আমাদের উচিত সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনাগুলোতে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি যেখানে সকল মানুষ নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। আমাদের উচিত মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ স্থানে রেখে একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা। আমাদের হাতে সময় খুব কম, এখনই সচেতন হতে হবে।
