শিরোনামটি পড়েই আমাকে কিছুটা থমকে যেতে হয়েছিল। “পুলিশে গেলে উল্টে আমদেরই দোষ” এমন একটি বক্তব্য যা শুধু একটু মন খারাপ করে দেয় না, বরং আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। আমরা যারা বাংলাদেশে বড় হয়েছি, তারা কমবেশি সবাই জানি যে বিচার প্রক্রিয়ার নানা ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু যখন নির্যাতিত হয়ে কেউ সাহায্যের আশায় পুলিশের কাছে যায় এবং উল্টো নতুন এক নিপীড়নের শিকার হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গে এ কথা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গেলে, আমি একবার এক ছোটখাটো ঘটনায় থানায় গিয়েছিলাম। মনের মধ্যে একটু ভয় ছিল বটে, কিন্তু আমি আশা করেছিলাম যে আইন আমাকে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝলাম, কথায় কথায় পুলিশ আমাদেরকে প্রশ্ন করতে শুরু করলো, যা আমাদেরকে অপরাধী বানানোর মত। তখনই বুঝলাম, এটাই নাকি আমাদের দেশের অপ্রকাশিত নিয়ম। সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বন্ধুদের সাথে আলোচনা করলাম। তারা সবাই বললো, “ভাই, পুলিশে গেলে এটাই হয়।”
গবেষণার তথ্য বলছে যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রায়শই পুলিশের কাছে সাহায্যের জন্য গেলে তাদেরকে কোনো না কোনোভাবে দোষী বানিয়ে দেয়া হয়। সত্যিই, এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বিষয়। আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রতিনিয়ত নানা ধরনের বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়। তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে নানা বাধা। অনেক সময় তাদের অভিযোগ করতে যাওয়াটা যেন এক প্রকার নতুন ঝামেলা ডেকে আনার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। এই ভীতি আর অবিশ্বাসের কারণে তারা অনেক সময় সাহায্য খোঁজার চেষ্টা করেও পিছু হটে আসে।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন পুলিশ এমন আচরণ করছে? অনেকে বলবেন, পুলিশও তো মানুষ, তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু সেটা কি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নির্যাতিত মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে উল্টো তাদেরকে হয়রানি করতে হবে? এই প্রসঙ্গে বলতে হয় যে, পুলিশের কাজই হচ্ছে আইনের রক্ষক হয়ে জনগণের সেবা করা।
আমার মতে, এর অন্যতম কারণ হতে পারে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। পুলিশের অনেক সদস্য নিজেরাই জানেন না কীভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে আচরণ করা উচিত। এ ছাড়াও দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অসাধু কাজকর্ম পুলিশের মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, তারা নিজেদের কাজকে ঠিকভাবে পালন করতে পারছে না।
উপসংহারে যা বলতে হয়, তা হলো আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত রাখা একটি মৌলিক দায়িত্ব। তাদেরকে যদি সঠিক বিচার পাওয়ার জন্য পুলিশের কাছে যাওয়ার স্বাধীনতা ও সুরক্ষা না দেওয়া হয়, তবে তাদের জীবনে ন্যায়বিচার পাওয়া কতটুকু সম্ভব? আমাদের পুলিশ বাহিনীর উচিত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আরো সংবেদনশীল হওয়া। যদি এমনই চলতে থাকে, তাহলে আমাদের সমাজে কি আদৌ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে? মনে হয়, আমাদেরকেই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।
