শিরোনামটা পড়েই মনে হলো, এই তো সেই নাজুক বিষয় যা নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো কত গুঞ্জন বয়ে যায়। গ্রামবাংলার বৈশাখী মেলা একটা সময় ছিল যখন এই মেলাগুলো শুধুমাত্র আনন্দের জন্যই নয়, বরং আমাদের লোকজ সংস্কৃতির একটি বড় অংশের প্রতীকও ছিল। কিন্তু আজকাল আমরা দেখতে পাচ্ছি, বৈশাখে গ্রামীণ মেলায় হিন্দু শিল্পীদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। কেন এমনটা হচ্ছে? এর পিছনে কি ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কোনো ভূমিকা আছে?
আমাদের দেশের লোকজ সংস্কৃতির কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে বাউল গান, ঝুমুর নাচ, যাত্রা পালার কথা। গ্রামের মানুষদের জন্য এ এক নিত্যনতুন বিনোদনের মাধ্যম। বৈশাখী মেলা আমাদের সেই পুরনো চেনা পরিবেশের সঙ্গে নববর্ষের আনন্দ যোগায়। কিন্তু হঠাৎ করেই এই মেলার ছন্দে যেন কেউ কিছুটা নীরব সুর তুলেছে। শোনা যায়, কিছু কিছু গ্রামীণ মেলায় হিন্দু শিল্পীদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এর পেছনে কি শুধুই ধর্মীয় রক্ষণশীলতা কাজ করছে, নাকি এর পিছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, সেটা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই কম বেশি বৈশাখী মেলা হয়। আমাদের দেশের গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই রীতিনীতির ছায়ায় যদি শিল্পীদের প্রতি অন্যান্যায় আচরণ করা হয়, তবে সেটা খুবই দুঃখজনক। আমি নিজেই দেখতে পেয়েছি যে, অনেক সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে কিছু সংকীর্ণমনা মানুষ নিজেদের মতামত অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। মজার ব্যাপার হলো, এই সংকীর্তমান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বুঝতে পারে না যে, তাদের এই আচরণ আমাদের বহুমাত্রিক লোকজ সংস্কৃতির সুরকে কিভাবে নষ্ট করছে।
কিন্তু শুধু কি ধর্মীয় রক্ষণশীলতা? পরিবর্তিত সমাজে হিন্দু শিল্পীদের মেলায় অংশগ্রহণ বন্ধ করার আর কি কোনো কারণ রয়েছে? হয়তো আছে। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব এবং সামাজিক চাপও অনেক সময় বড় ভূমিকা পালন করে। রাজনীতিক বা স্থানীয় নেতা যারা নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, তাদের প্রভাবও এখানে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তাহলে আমাদের করণীয় কি? আমরা কি এই অবস্থার পরিবর্তন করতে পারি না? আমি মনে করি, পারি। আমাদের উচিত প্রথমে সমাজের মধ্যে সচেতনতা জাগানো। ধর্মীয় রক্ষণশীলতার নামে যদি সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, তবে সেটা আমাদের সবার জন্যই ক্ষতিকর। আমাদের উচিত নীতি নির্ধারণে এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করা, যাতে ধর্মের নামে কেউ সংস্কৃতিকে আঘাত করতে না পারে।
আরও একটি বিষয় চিন্তা করা দরকার, সেটা হলো আমাদের বড় শহর থেকে সঠিক নেতৃত্বের। আমাদের শহরের শিক্ষিত মানুষদের উচিত গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা এবং তাদের সচেতন করা, যাতে তারা বুঝতে পারে যে লোকজ সংস্কৃতির মধ্যে কোনো ধর্ম-বিভেদের স্থান নেই।
আমাদের লোকজ সংস্কৃতি কখনোই শুধু একটি ধর্মের বা সম্প্রদায়ের ছিল না। এটি সব সময়ই আমাদের জাতিগত ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। গ্রামীণ মেলায় হিন্দু শিল্পীদের বাদ দেওয়া শুধু শিল্পীর ক্ষতি নয়, বরং পুরো সমাজেরই অপূরণীয় ক্ষতি। এর বিরুদ্ধে আমাদের সচেতন হতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই মেলায় হিন্দু শিল্পীদের দেখছি না, নাকি শুধুই কিছু একতরফা খবর শুনছি? আমাদের উচিত সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া। আমাদের উচিত এই ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং সত্যিকার অর্থে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আগানোর চেষ্টা করা।
আমি বিশ্বাস করি, আমাদের কাজ করা উচিত এমনকি যদি তা ছোট ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু হয়। এই ছোট পদক্ষেপই একদিন বড় পরিবর্তন আনবে। আমাদের আকাঙক্ষা শুধু লোকজ সংস্কৃতিকে রক্ষা করা নয়, বরং তা সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা। প্রত্যেককেই এই মঞ্চে আসার, শিল্প দেখানোর এবং আনন্দ পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
অবশেষে, আমি বলতে চাই, আমাদের দেশটা যেমন একাত্তরের যুদ্ধের সময় ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে স্বাধীন হয়েছিল, তেমনিভাবেই আমাদের সংস্কৃতির প্রতিও সেই মনোভাব ধরে রাখতে হবে। আমাদের সকলকে মিলে এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে, যেন আমাদের বৈশাখী মেলাগুলো সত্যিই হয় সবার জন্য এক উল্লাসের মঞ্চ। তোমার মতামত কী? তুমি কি মনে করো আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার মধ্যে সামঞ্জস্য আনা সম্ভব?
