বন্ধুরা, এক কাপ চা হাতে নিন, কারণ আজ আমরা এমন একটি বিষয়ে কথা বলব যা শুধু আমাদের সমাজে নয়, আমাদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। এই বিষয়টি খুবই বাস্তব এবং বেশিরভাগ তরুণের জীবনের সাথে জড়িত। হ্যাঁ, আমি কথা বলছি সেই স্বপ্নের যা বুকে নিয়ে অনেক তরুণ স্যুটকেস গুছায় বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে, আর সেই স্বপ্নের পোশাকি নাম ‘বিদেশ যাওয়া’। তবে এই স্বপ্নের পেছনেও রয়েছে কিছু ভয়ংকর বাস্তবতা, বিশেষ করে যখন অবৈধ রুটে যেতে হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বেকারত্বের হার ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে সবার চোখে একটাই স্বপ্ন বাইরে গিয়ে ভালো কিছু করা। আর এই স্বপ্নের পিছনে দৌঁড়াতে গিয়ে কত তরুণ যে জীবনের ঝুঁকি নেয়, তার হিসাব নেই। আমরা সবাই জানি, বৈধ পথে বিদেশ যাওয়া অনেক সময়, অর্থ ও ধৈর্যের ব্যাপার। আর তাই অনেকেই সহজ পথ খুঁজতে গিয়ে ফাঁদে পড়ে যান দালালদের। আর সেই পথেই শুরু হয় ভয়ংকর এক যাত্রা।
অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখাটা অনেকটা মরুভূমিতে দিগন্তের সীমানায় পানি দেখার মতো। এই স্বপ্নের পিছনে লুকিয়ে থাকে বিপদ, দুশ্চিন্তা আর অনেক সময় মৃত্যুর ছায়া। শুধু টাকা-পয়সার লোভে অনেক দালাল তরুণদের ভুল পথে নিয়ে যায়, আর তাদের ঠেলে দেয় অন্ধকার এক ভবিষ্যতের দিকে। এই দালালরা কাউকে বলে সাগরের পথে পাড়ি দিতে, কাউকে বলে ভিন্ন দেশের ভিসায় এসে পলাতক হয়ে থাকতে। আর এই সবকিছুর পিছনে থাকে অবৈধ পথের ভয়াবহতা।
একটি উদাহরণ দিয়ে বলি, সজল নামের একটি ছেলে, যার গল্প শুনলে গা শিউরে উঠবে। গ্রামের গরিব ঘরের সন্তান সজল, যার স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে কিছু অর্থ উপার্জন করে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করা। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় এক দালালের প্ররোচনায় সজল ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা তাকে টেনে নিয়ে যায় লিবিয়ার মরুভূমিতে। তারপর শুরু হয় তার দুঃস্বপ্নের যাত্রা। অবৈধ পথে পাড়ি দিয়ে সাগরের বুকে হেরে গিয়ে সজল চিরতরে হারিয়ে যায়।
কিন্তু এত কিছুর পরও কেন এই তরুণেরা এমন ঝুঁকি নেয়? এর পিছনে রয়েছে অনেক কারণ। প্রথমত, অর্থনৈতিক সমস্যা যেখানে দেশের ভেতরেই কাজের অভাব, সেখানে বিদেশ গিয়ে কিছু করলেই অর্থের অভাব থাকবে না। দ্বিতীয়ত, সমাজের চাপ যেখানে প্রতিবেশীরা দেশ ছেড়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন পূরণ করছে, সেখানে নিজেদের পিছিয়ে থাকার অনুভূতি। তিন নম্বর কারণ, পরিবার যেখানে পরিবারের প্রত্যাশা এতটাই বেশি যে তরুণদের উপর চাপ পড়ে, সেখানে কিছু করে দেখাতে হবে। আর হ্যাঁ, দালালদের প্রলোভন তো আছেই, যারা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের অন্ধকারের পথে নিয়ে যায়।
আমাদের দেশের তরুণদের এই অবৈধ পথে যাওয়ার কারণে কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় না, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষতিও হয়। সামাজিকভাবে বঞ্চিত আর মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই তরুণেরা যেমন নিজের জীবন হারায়, তেমনই তাদের পরিবারও তাদের হারায় চিরতরে। আর এমন বহু পরিবার আছে যা আজও অপেক্ষায় থাকে তাদের প্রিয়জনের ফিরে আসার জন্য, কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ হয় না। রাষ্ট্রের জন্যও এটি একটি বড় সমস্যা, কারণ অবৈধ অভিবাসনের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের উপায় কী? প্রথমত, আমাদের দেশে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর উচিত তরুণদের জন্য বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু রাখা, যাতে তারা বিদেশে না গিয়েও দেশের ভেতরেই কিছু করতে পারে। দ্বিতীয়ত, সচেতনতা বাড়াতে হবে অবৈধ পথে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে। বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত, দালালদের কঠোর প্রতিরোধ করতে হবে। প্রশাসনের উচিত দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অবৈধ অভিবাসন বন্ধে সতর্কতা অবলম্বন করা।
সবশেষে, আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত এ বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং অন্যদের সচেতন করা। টিকে থাকার এই যুদ্ধে আমরা যেন আমাদের তরুণদের হারিয়ে না ফেলি। এই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। একদিন হয়তো এই অবৈধ রুটের ভয়ংকর বাস্তবতা বদলে যাবে এবং সত্যিকার অর্থে আমাদের তরুণেরা দেশে এবং বিদেশে সাফল্য অর্জন করবে। কিন্তু সেই দিনটি আসবে কি? এটা ভাবতে আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
