দুর্গা প্রতিমা ভাঙার রাজনীতি: প্রতি বছরই কেন পুনরাবৃত্তি একই স্ক্রিপ্ট?
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা একান্তভাবেই একটি ধর্মীয় উৎসব, যেখানে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের পরম্পরাগত দেবী দুর্গার আরাধনা করে। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ঘটে যায় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, যা আমাদের সমাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কিছু গভীর সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করে। প্রতিমা ভাঙা, মন্দিরে হামলা, আর প্রতিটি দুর্গাপূজার সময় আছড়ে পড়া ধর্মীয় বৈষম্য – এই সবকিছু আমাদের দেখায় যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এখনো কতটা দূরে। প্রতি বছরই আমরা যেন দেখি একই নাটকের পুনরাবৃত্তি।
প্রথমেই ভাবতে হবে, কেন এমন হয়? কেন প্রতি বছরই দুর্গাপূজার সময় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে? এর পিছনে কি কোনো গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে, নাকি শুধুই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৌশল? যখন আমরা এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবি, তখন আমাদের মাথায় আসে কিছু নির্দিষ্ট কারণ।
প্রথমত, রাজনৈতিক লাভ: নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই ধর্মীয় সম্প্রীতিকে নিজেদের ফায়দা তোলার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ফায়দা তোলার খেলায় প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ জনগণ। মন্দিরে হামলা বা প্রতিমা ভাঙার ঘটনাগুলোকে ব্যবহার করে তারা একদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। ফলে একটি ভয়াবহ বিভাজন তৈরি হয় যা নির্বাচনী ফলাফলেও প্রভাব ফেলে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক বিদ্বেষ: আমাদের সমাজে দীপ্তিমান হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ। এই বিদ্বেষ এতটাই গভীর যে, ছুতো পেলেই সেটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অনেক সময়ই এই ধরনের হামলা ঘটে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত শত্রুতার কারণে, তবে মিডিয়ার দৌলতে তা খুব সহজেই পায় ধর্মীয় রূপ। এই বিদ্বেষকে উস্কে দেওয়ার জন্য কিছু মিডিয়া চ্যানেল এবং সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত ক্ষতিকারক। তারা যেন ইচ্ছা করেই আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।
তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যর্থতা: প্রতিটি দুর্গাপূজার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দ্বন্দ্ব প্রতিরোধে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা প্রায়শই অপ্রতুল বলে প্রমাণিত হয়। ফলে প্রতিমা ভাঙা বা মন্দিরে হামলার মত ঘটনা সহজেই সংগঠিত হয়। এই ব্যর্থতার পেছনে অবশ্যই রাজনৈতিক চাপ এবং প্রভাব কাজ করে। যদিও সরকারের তরফ থেকে আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে তারা কঠোর পদক্ষেপ নেবে, তবু বাস্তবে আমরা দেখতে পাই খুব কম ক্ষেত্রেই দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এই সমস্ত কারণের মূলে রয়েছে একটি বড় সমস্যা – শিক্ষা এবং সচেতনতার অভাব। আমাদের সমাজের বৃহত্তর অংশ এখনো ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মর্ম বুঝতে ব্যর্থ। আমরা যদি প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং মানবিকতার মর্মার্থ বোঝাতে পারি, তাহলে হয়তো এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।
তাহলে আমাদের করণীয় কি? প্রথমেই, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে এ ধরনের সংকীর্ণ রাজনীতির পথ থেকে সরে আসা। তাদের উচিত হবে জনগণের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা প্রচার করা। ধর্মীয় নেতাদেরও উচিত হবে বাস্তবিক অর্থে তাদের অনুসারীদের শান্তি এবং সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেওয়া।
মিডিয়ার ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে হয়তো আমরা দেখতে পাবো এমন একটি সমাজ যেখানে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বাস্তবায়িত হয়েছে। মিডিয়াকে উচিত হবে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে সেগুলোকে শুধুমাত্র ‘সংবাদ’ হিসেবে দেখানোর পরিবর্তে এর পিছনের কারণ এবং সমাধান নিয়ে আরও গবেষণা করা।
এখনো সময় রয়েছে। আমরা যদি আমাদের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পারি এবং সমাজে সচেতনতা বাড়াতে পারি, তাহলে আমরা সম্ভবত এই ধরনের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে সক্ষম হবো। একদিন হয়তো আমরা এমন একটি সমাজ পাবো যেখানে দুর্গাপূজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সব সম্প্রদায়ের জন্য মিলনমেলার এক অনন্য উপলক্ষ হয়ে উঠবে।
তাহলে আপনি কী ভাবছেন? আমরা কি পারবো আমাদের সমাজকে এই ধর্মীয় বিদ্বেষের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করতে? নাকি প্রতি বছরই আমরা একই স্ক্রিপ্টের পুনরাবৃত্তি দেখতে থাকবো? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। আমাদেরই ঠিক করতে হবে কোন পথে আমরা এগোতে চাই, কারণ এই সমাজের দায়িত্ব আমাদেরই কাঁধে।
