চা খেতে খেতে তোমাদের সাথে একটু গল্প করতে চাই। তবে আজকের গল্পটা একটু অন্যরকম। আমাদের দেশের একটা গল্প, যা বড্ড বেশি মর্মান্তিক এবং চিন্তাশীল। ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যায়, যখন বসে বসে এই লেখাটা লিখছি, তখন মনে হচ্ছে এই মুহূর্তটি ঠিক এই সময়ের চেয়ে আর ভালো হতে পারে না। কারণ সাম্প্রতিককালে আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমাদের নিরাপত্তা আর শান্তির অবস্থান কতটা অনিশ্চিত।
সাম্প্রতিককালে একটা তথ্য আমাদের সামনে এসেছে। জানুয়ারি মাস থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারির এই তারিখ পর্যন্ত দেশে ২২১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেখতে হয়তো সংখ্যাটা তেমন বড় কিছু নয়, কিন্তু এর মধ্যে একটা ঘটনা এমন যা আমাদের দেশে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। সেই একটি ঘটনায় একজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। হয়তো কেউ বলবে, একজন মাত্র, তা নিয়ে এত মাতামাতি কেন? কিন্তু বন্ধুরা, এখানে সংখ্যাটা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। এখানে প্রতিটি জীবনের মূল্য অসীম।
এটা তো আমাদের দেশ, যেখানে আমরা জন্মেছি, বড় হয়েছি। এক টুকরো মাটির জন্য আমরা কত সংগ্রাম করেছি। কিন্তু সেই মাটিতেই যখন এই ধরনের ঘটনা ঘটে, তখন বুঝতে পারি আমাদের সামনে কত বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। আমাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। হয়তো কেউ বলবে এটা তো পুলিশের দায়িত্ব, সরকারের কাজ। কিন্তু সত্যি বলতে, এ দায়িত্ব আমাদের সবার।
বছরের শুরুতেই আমরা এমন কিছু ঘটনা দেখেছি যেগুলো আমাদের সমাজে এক ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে। এবং এই ভীতির পরিবেশটাই সবচেয়ে খারাপ। আমরা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এই ভয়ের সাথে বসবাস করছি। আমাদের সন্তানরা স্কুলে যাচ্ছে, আমরা অফিস যাচ্ছি, কিন্তু মনের ভেতর কোথাও একটা অজানা আশঙ্কা কাজ করছে। আর সেটা এই ঘটনার সংখ্যার চেয়ে অনেক বড়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভীতির পরিবেশ থেকে আমরা কীভাবে মুক্তি পাব? ব্যক্তিগতভাবে, আমি মনে করি আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে। নিজেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে কীভাবে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো যায়। আমাদের পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন অবশ্যই তাদের কাজ করছে। কিন্তু আমাদেরও নিজের দিক থেকেও কিছুটা দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কোথাও কোনো সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লে সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে আমাদের আরও বেশি সাবধান হতে হবে। কখনো কখনো ভুল তথ্য বা অপপ্রচার আমাদের মধ্যে ভীতি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এই কারণে আমাদের উচিত কোন তথ্যকে বিশ্বাস করবেন, কোনটা করবেন না সেই বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করা।
এই হামলার ঘটনার পেছনে আসলে কী কারণ আছে তা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যাবে এখানে বিভিন্ন দিক রয়েছে। কিছু ঘটনা ঘটনাচক্রে ঘটে, আবার কিছু পরিকল্পিত। আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানও এর জন্য দায়ী। আর এজন্য রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সংঘর্ষ অনেক সময় সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব ফেলে। আমরা যদি একসাথে কাজ করতে পারি, তবে অনেক কিছুরই পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এখন আমি তোমাদের কাছেই একটা প্রশ্ন রাখতে চাই। আমরা কি সত্যি করে এই ভয়ের পরিবেশে বাস করতে চাই? আমাদের সন্তানদের এই ধরণের একটি সমাজে বড় হতে দেখতে চাই? যদি না চাই, তবে আমাদের নিজেদের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের নিজেদের মতো করে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে হবে যা আমাদের সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, কেউ একা কিছু করতে পারবে না, কিন্তু আমরা সবাই মিলে অবশ্যই পারবো।
যদি আমরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে পারি, আমাদের চিন্তাধারা, আমাদের কর্মপদ্ধতি পরিবর্তন করতে পারি, তবে হয়তো আমাদের সামনে একটা সুন্দর বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে। আর এজন্য প্রয়োজন আমাদের একসঙ্গে কাজ করা, একে অপরকে বুঝতে পারা এবং সহযোগিতা করা। কারণ, ভাই আমার, আমাদের দেশ কিন্তু আমাদের হাতে। আমরা না বদলালে কে বদলাবে?
আবারও, মনে করিয়ে দিতে চাই, সংখ্যাটা যতই ছোট হোক না কেন, এর প্রভাব কিন্তু অনেক বড়। আর তাই, আমাদের নিজেদের সচেতনতা এবং যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই ভীতির আবহাওয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আসুন, আমরা সবাই মিলে একটা সুন্দর, শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করি।
