বাংলাদেশে এমন একটা সময়ে আছি আমরা যখন দ্রব্যমূল্য আর আমজনতার পকেটের মাপ যেন বিপরীতে হেঁটে চলছে। বাজারে গেলেই টের পাই, এক কেজি আলু কেনার জন্য আগে যেখানে সোজা ২৫ টাকা দিতাম, এখন সেখানে দ্বিগুণ খরচ করতে হয়। কিন্তু আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, এই দ্রব্যমূল্যের মিছিলে সবচেয়ে আগে টার্গেট হয় কারা? হ্যাঁ, আপনি ঠিক ধরেছেন, সংখ্যালঘু দোকান। এই টার্গেট করার পেছনে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং ধর্মীয় রূপও দিতে দেখা যায়। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বসুন, আজ এই বিতর্কিত বিষয়টাই একটু খোলাসা করি।

দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি তো বাংলাদেশের জন্য কোনো নতুন কথা নয়। বছরের পর বছর ধরে আমরা এই সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি। কিন্তু যখনই কোনো বিশেষ সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন আমাদের নজর যায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দিকে। এটা কি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষোভ, নাকি এর পেছনে আরো গভীর কোনো কারণ আছে? আমাদের দেশে অর্থনীতির অবস্থা যখনই খারাপ হয়, তখনই কিছু মানুষ সেই ক্ষোভকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। আর এটাই বিপদজনক। যেকোনো সমস্যায় যদি প্রথম দোষারোপ করা হয় কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে, তাহলে সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, বরং তা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

আমাদের ইতিহাস বলছে, বিশেষ করে যখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত, তখনই এই ঘটনা বেশি ঘটে। সন্তুষ্টিজনক নীতিমালা প্রণয়ন না করে যদি আমরা কেবলমাত্র ক্ষোভের প্রকাশ দেখাই, তবে সমস্যার মূল উদঘাটন হবে না। অনেক সময় দেখা যায়, সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য উচ্চ দামে বিক্রি করে বলে গুজব ছড়ানো হয়। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যদি আমরা দেখি, তখন বুঝতে পারি যে এই সমস্যা সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার। যারা গুজব ছড়ায়, তারা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্যই এমনটা করে থাকে।

আমি নিজে একবার প্রত্যক্ষ করেছিলাম এমন একটি ঘটনা। ঢাকার একটি বাজারে হঠাৎই খবর রটে যায়, হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি মুদির দোকান নকল চাল বিক্রি করছে। গুজবের ফলে যারা আগে সেই দোকানে প্রতিদিন যেত, তারা হঠাৎই অন্য দোকানে চলে যায়। অথচ পরে জানা যায়, সেই গুজবটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল। এমন ঘটনা কেবল ঢাকায় নয়, বরং দেশের অন্যান্য জেলাতেও ঘটে থাকে। কিন্তু কেন এই গুজব এবং কেন এই ভীতি? আমার মনে হয়, এই গুজব ছড়ানোর পেছনে কেবল অর্থনৈতিক লাভ নয়, বরং সামাজিক এবং ধর্মীয় ভেদাভেদও একটি বড় কারণ।

যখন অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হয়, তখন সমাজের অবস্থা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সেই সময়টাতে আমাদের সবার উচিত একসাথে সমস্যার মোকাবেলা করা। কিন্তু তার পরিবর্তে যদি আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়, তবে তা কোনোভাবেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। আমাদের একথা অবশ্যই মনে রাখা উচিত, যে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই একই কাতারে। ইকোনমিক ইম্প্যাক্ট তো সকলের উপর সমানভাবে পড়ে, কিন্তু দোষারোপ যদি একপেশে হয়, তবে সেটা কখনোই সমাধান নয়।

এই ব্যাপারে সরকারেরও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। শুধু ভালো নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং সেই নীতির কার্যকরী ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক লাভের আশায় সেই সমস্যাকে জিইয়ে রাখা হয়। অর্থনীতিকে সামগ্রিক উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে হলে আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে। সংখ্যালঘুদের টার্গেট করা আমাদের ঐক্য এবং দেশপ্রেমের জন্য ক্ষতিকর। সবার আগে আমাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্যের সেতু তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে আমরা যেকোনো সংকট মোকাবেলা করতে পারি।

শুধু সরকার নয়, আমাদের প্রত্যেকেরও উচিত এই বিভাজনময় পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সচেতন হওয়া। আমার বিশ্বাস, আমরা যদি একসাথে কাজ করি, তবে একদিন এই সমস্যার সমাধান অবশ্যই সম্ভব হবে। আর যদি আমরা না জাগি, তাহলে এই সম্প্রীতি আর ঐক্যের স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না। প্রশ্নটা এখানেই, আমরা কি সেই সংখ্যালঘুদের সাথে একজোট হয়ে দ্রব্যমূল্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত? নাকি আমরা কেবল একপেশে দোষারোপ করে নিজেদের সংকীর্ণ মনোভাবের শিকার হবো? ভাবনাটা আপনাদের উপরই ছেড়ে দিলাম।

By anirban