শহরের হানিফ পাগলা মোড় এলাকায় অবস্থিত নরসুন্দর পরেশ চন্দ্র শীল (৬৯) ও তার ছেলে বিষ্ণু চন্দ্র শীলের (৩৫) দোকানে একদল লোক গিয়ে তাণ্ডব চালায়। তারা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাবা ও ছেলেকে বেধড়ক মারধর করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল লোক ওই বাবা ও ছেলেকে নির্মমভাবে প্রহার করছে। এরপর সদর থানা থেকে একদল পুলিশ গিয়ে জনতার হাত থেকে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। ঘটনাটি প্রকাশ পেলে কয়েক শত ভক্ত থানার সামনে জমায়েত হয়ে স্লোগান দিতে শুরু করে।
এ ধরনের ধর্ম অবমাননার ঘটনা এটাই প্রথম নয়, এই কট্টরপন্থী মুসলমানরা এভাবে হিন্দু সংখ্যালঘুদের হত্যার পরিকল্পনা করছে, কারণ তারা বিশ্বাস করে নির্বিচারে ধর্ম অবমাননা করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে হিন্দুশূন্য করে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো ও মুসলিম সমাজের একাংশ নাস্তিক, সমকামী ও হিন্দু সংখ্যালঘুদের এভাবে হত্যার পরিকল্পনা করেছে।
ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে ওসি মোহাম্মদ নূরনবীকে বলতে শোনা যায়, ‘একজন ওসি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। কিন্তু যে ঘটনা ঘটেছে, তা আমার হৃদয়েও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তোমাদের মতো আমারও চোখে পানি এসেছে। এ দেশে কীভাবে এমন উদ্ধত আচরণ করা সম্ভব? আমি তোমাদের কথা দিচ্ছি, আমি যখন তাদের গ্রেপ্তার করেছি, আমি তাদের বিরুদ্ধে এমন মামলা দেব যে, বাংলাদেশে আমি অবশ্যই তাদের আজীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসি নিশ্চিত করব।’

লালমনিরহাট, বাংলাদেশে এক প্রবীণ হিন্দু নাপিত পরেশ চন্দ্র শীল ও তার ছেলেকে একদল মুসলিম ইসলাম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে নির্মমভাবে আঘাত ও মারধর করেছে।
যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ না জেনে, কতগুলো ঘটনা কীভাবে ঘটেছে তা যাচাই না করেই এ ধরনের বক্তব্য দেয়, তাহলে সংখ্যালঘুরা কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভরসা করতে পারবে? তারা ন্যায়বিচার চাইবে কার কাছে? যখন পুলিশই দুর্নীতিগ্রস্ত, তখন আপনি কাকে বিশ্বাস করবেন?
যখন এই ওসিকে জিজ্ঞেস করা হয়, ঘটনা না জেনেই তিনি কেন এমন কথা বলেছিলেন, তখন তিনি সেই পুরোনো ইতিহাসসম মিথ্যায় আশ্রয় নেন, যা পুলিশ সবসময়ই ব্যবহার করে, ভাইরাল হওয়া ওই বক্তব্য নাকি তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও উপস্থিত মানুষকে শান্ত করার জন্য দিয়েছিলেন। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নাকি ছিল না। অথচ উদ্দেশ্য সবসময় একই। ধর্ম অবমাননার মামলা দিয়ে হিন্দুদের পিটিয়ে জখম করা, অথবা জেলে পাঠিয়ে সেখানে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা। জেলহত্যার এমন অনেক ঘটনাই আপনারা আগে দেখেছেন। এ বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। দেশের কট্টর মৌলবাদী মুসলমানরা, সরকার ও প্রশাসন ধর্ম অবমাননার মামলাকে হিন্দু সংখ্যালঘুদের হত্যা বা ফাঁসানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
আর এলাকার ইমামরাই এসব ঘটনার মূল প্ররোচক। নামতারীর আল হেরা জামে মসজিদের ইমাম মো. আবদুল আজিজ বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। সেই মামলায় পরেশ চন্দ্র শীল ও বিষ্ণু চন্দ্র শীলকে আসামি করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক কার্যকলাপ ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে। ধর্ম অবমাননার মামলায় সাধারণত জামিন মেলে না। এ ধরনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ মানুষ পুলিশি নির্যাতনের কারণে জেলেই মারা যায়।
গ্রেপ্তার বিষ্ণু চন্দ্রের স্ত্রী দীপ্তি রানী শীল বলেছিল , তিনি জেলে থাকা তার স্বামী ও শ্বশুরের সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা বলেছিল , গত শুক্রবার চুল কাটাতে আসা এক গ্রাহকের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া নিয়ে সামান্য কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। পরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে, ঘটনার দুই দিন পর শত শত লোক সেলুনে যায়, ভক্তদের ভুল পথে প্ররোচিত করে তার স্বামী ও শ্বশুরকে বেধড়ক পিটিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। প্রশ্ন করেছিলো , ‘আমি আর কোনোদিন কি আমার স্বামীকে দেখতে পাব? এবার ওকে মেরে ফেলবে। কারণ ধর্ম অবমাননার মামলায় তো জামিন নেই। এর আগে অনেক হিন্দু এভাবেই মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেলেই মারা গেছে। সংসারে আর উপার্জনের আর কেউ নেই। আমরা চরম অনিরাপত্তায় আছি। আমি আমার শ্বশুর ও স্বামীর মুক্তি চাই।’

মামলার বাদী মো. আবদুল আজিজ, তার বয়স ২৯ বছর। এই শয়তান ইমাম খুব ভালো করেই জানতেন কীভাবে এসব হিন্দুকে ফাঁসির মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া যায়, কীভাবে জনতা জড়ো করে জমি দখল করা যায়, যাতে ভয়ে হিন্দুরা দেশ ছেড়ে পালায়। নইলে তাদের গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হবে। কারণ, কেউ যদি গণপিটুনিতে মারা যায়, সেই হত্যার বিচার সাধারণত হয় না।
সে বলেছে, ওই হিন্দু মালাউন কাফের নাকি বহু মানুষের সামনে মহানবী (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অপমান করেছে। রোববার বিকেলে উপস্থিত ভিড় ও ভক্তদের সামনে তারা এ ঘটনার জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে এবং বলে, তারা ভুল করেছে।যদি মাফ চেয়েই থাকে তাহলে গণপিটুনি কেন দিলো? আবার ধর্ম অবমাননার মামলা দিয়ে কেন ফাঁসালো ? এখন ঘটনাটিকে অন্য খাতে নেওয়ার জন্য পরিবারের লোকেরা নাকি চুল কাটার টাকার ঝগড়ার কথা বলছে, যা মোটেও সত্য নয়। শক্তি তাদের হাতে। বাংলাদেশের এসব কট্টরপন্থী মুসলমানদের বাস্তব চিত্র এটাই। কারণ ক্ষমতাও তাদের, জোরও তাদের হাতেই। এইভাবেই শেষ হয়ে যায়। যেভাবে খুন হয়েছিলো নাস্তিকেরা, সমকামীরা, আর হিন্দু সংখ্যালঘুরা।বিচার হবে কঠোর। মামালায় জামিন মিলবে না। এই অসহায় মানুষগুলো এভাবেই জেলে হত্যার স্বীকার হয়ে মরে যাবে। সরকার চুপ থাকবে।কারন সরকার এই ধর্ম অবমাননার মামলা তৈরি করেছে। কারন এভাবেই বাংলাদেশ হিন্দু শুন্য হয়ে গাছে। নির্বিচারে মারা হচ্ছে হিন্দুদের।

