জমি বাঁচাতে আদালত–থানা–মিডিয়া–ডাকতার: এক হিন্দু কৃষকের অনন্ত দৌড়
বাংলাদেশের মাটিতে আজও কোনো একটি ছোট গায়ের কৃষকের গল্প শুনলে অনেক সময়ই মনে হয় যেন এক মহাকাব্যিক যুদ্ধ। এই দেশ যেখানে কৃষকদের জন্য অবিশ্বাস্যভাবে সমৃদ্ধ এক ভূমি, সেখানে একজন হিন্দু কৃষক যখন নিজের জমি রক্ষার জন্য আদালত থেকে থানা, মিডিয়া থেকে ডাকতার পর্যন্ত ছুটে বেড়ায়, সেই ঘটনাগুলো শুনে আমরা যেন এক অদ্ভুত বাস্তবতার সম্মুখীন হই। আজকের এই লেখায় আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরবো এমনই এক কৃষকের গল্প, যা হয়তো অনেকের চোখ খুলে দেবে এবং কিছু ভাবাবে।
শুধু কল্পনা করুন, জামালপুরের এক ছোট্ট গ্রাম। সেখানে বাস করেন বিমল চক্রবর্তী। বছর পঞ্চাশের মানুষ, কৃষিকাজই তার জীবন। এই পেশার ওপরই নির্ভর করে তার পরিবারের সমস্ত প্রয়োজন। আমি জানি, বিমলের মতো মানুষগুলোই আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। অথচ কতটা অবহেলিত তারা! বিমলের জমি নিয়ে ঝামেলা শুরু হয় এক বছর আগে। স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল তার জমিকে নিজেদের বলে দাবি করতে শুরু করে। ভাবুন, একদিন সকালে উঠে দেখলেন আপনার বসত বাড়ির জমি আর আপনার নেই! হতাশায় ভেঙে পড়লেও বিমল হাল ছাড়েননি। তিনি ছুটে গিয়েছিলেন থানায়, কিন্তু কোনো সাহায্য পাননি। যাদের সাহায্যের জন্য আমাদের এতটা আশা থাকে, তারা যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন চোখে অন্ধকার দেখা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
এই জায়গা থেকেই শুরু হয় বিমলের অনন্ত দৌড়। জমি রক্ষার জন্য আদালতে মামলা করলেন। কিন্তু মামলার তারিখ পিছিয়ে যায়, শুনানি হয় না। এদিকে প্রতিপক্ষের হুমকি তো রয়েছেই। তাহলে কী করতে হবে? বিমল তার সমস্যার কথা মিডিয়াকে জানালেন। কিছুটা সাড়া পেলেনও, তবে সেটাও নিতান্তই অপ্রতুল। যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের উত্তরসূরিদের এই দুরবস্থা দেখে সত্যিই হৃদয় বিদীর্ণ হয়।
এই দেশের সব শক্তি যদি একসঙ্গে দাঁড়ায়, তাহলে কারা এই মানুষদের ওপর অত্যাচার করতে সাহস পাবে? বিমল নিজেকে অসহায় মনে করলেও থামেননি। গ্রামের ডাকতার বাবুর কাছে গেলেন। তিনি কিভাবে সাহায্য করবেন? বিমলকে তিনি পরামর্শ দিলেন, মামলা চালিয়ে যেতে। কিন্তু মনের দিক থেকে দৃঢ় থাকার জন্য দুঃসাহস দেন। এই পরামর্শ কি যথেষ্ট? মনে হতে পারে না, কিন্তু কখনো কখনো সাহসের চেয়ে বড় শক্তি আর কিছু হয়না।
আমরা সবসময় ভাবি, এসব ঘটনা তো শুধু সিনেমায় হয়। কিন্তু দৃশ্যপটে যখন সত্যি ঘটনা উঠে আসে তখন তার বাস্তবিকতা আমাদের কষ্ট দেয়। এই ধরনের অবিচারের শিকার হতে হয় কেন? কেন আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে এত ভোগান্তি পোহাতে হয়? এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, সবার প্রথমে আইনী কাঠামোর দুর্বলতা। মামলাগুলো দীর্ঘায়িত হয়ে যায়, ফলে সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। এছাড়া, প্রভাবশালীদের দাপটে অনেক সময় প্রশাসনও নীতির বাইরে চলে যায়।
তবে শুধু দোষ দিয়ে লাভ নেই, আমাদের কিছু করতেও হবে। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে এই ধরনের সমস্যার সমাধান চাই, তাহলে আমাদের সমাজকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। মিডিয়া এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকরী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। আমাদের প্রতিনিধি যারা, তাদের উচিত এই ধরনের অন্যায় বন্ধে তৎপর থাকা। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিয়ে আমরা যাতে আরও সচেতন হই, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
বিমলের গল্প এখানেই শেষ নয়। তিনি ক্লান্ত, কিন্তু পরাজয় মেনে নেননি। হয়তো সময় লাগবে, তবে আমি বিশ্বাস করি, একদিন সুবিচার পাবেন। তাঁর এই সংগ্রাম শুধু তার নয়, আমাদের সবার। আমরা সবাই যদি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক হয়ে দাঁড়াই, তাহলে বুঝতে হবে সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন প্রভাবশালীদের দাপটের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জয় হবে।
তাহলে প্রশ্নটা রয়ে গেল আমরা কি প্রস্তুত এমন এক পরিবর্তনের জন্য, যেখানে সব বিমল চক্রবর্তীদের জন্য সুবিচার নিশ্চিত করা যাবে? যেখানে আর কোনো কৃষককে তার জমির জন্য এমন অনন্ত দৌড় দিতে হবে না? আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই, নতুবা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বিভ্রান্তির মধ্যে বসবাস করবে। আমি আশা করি, আমরা সবাই মিলে একদিন সত্যিকার অর্থে এই পরিবর্তনটা আনতে পারবো।
