২০২৫ সালটা যেন আমাদের দেশের জন্য একটা নতুন বাস্তবতার চেহারা তুলে ধরেছে। গত এক বছরে যে পরিমাণ সহিংসতা, আক্রমণ এবং অত্যাচার সংঘটিত হয়েছে, তা কোনমতেই একটি উন্নত সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। আর এইসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। আজকে আমি আপনাদের সাথে এই বিষয় নিয়ে একটু খোলাখুলি আলোচনা করতে চাই।
২০২৫ সালে আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা যেন এক ভয়াবহ স্বপ্নের মতো। এক বছরের মধ্যে ৫২২টি ঘটনা, যার মধ্যে ৬১টি খুন এবং ৯৫টি উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যায় লিপিবদ্ধ হয় না, এগুলো প্রতিটি হারানো প্রাণ, ভাঙা পরিবার এবং বিধ্বস্ত সমাজের গল্প বলে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর এমন সহিংসতার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে ২০২৫ সালে এই সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। একসময় এই দেশ ছিল বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু আমরা যদি এখন আমাদের চারপাশে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো যে এই সহিষ্ণুতার বুনিয়াদ কোথায় যেন ভেঙে যাচ্ছে।
বছরের শুরুতেই কিছু ঘটনা আমাদেরকে চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই একটি মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অপারদর্শিতার পরিচয় দেয়। এ ধরনের ঘটনায় যারা আক্রান্ত হয়, তাদের জন্য বাধাহীন বিচার প্রাপ্তি যেন একসময় শুধুই স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
যদিও সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছে, বাস্তবতা কিন্তু অন্য কিছু বলে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নীরব সমর্থন প্রদান করা হয়। এই নীরবতা অনেক সময়ই অপরাধীদের সম্মতি জোগায়। একটা কথা প্রচলিত আছে, “বিপদের সময় বন্ধু চেনা যায়”। কিন্তু আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বন্ধু কে? সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
প্রতিদিন আমাদের সংবাদপত্রের পাতা খুললেই এসব ঘটনা নজরে আসে। কিন্তু আমাদের সমাজ কি যথেষ্ট সংবেদনশীল এই বিষয়ে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অধিকাংশ মানুষ এসব ঘটনা দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। হয়ত তারা মনে মনে মেনে নিয়েছে যে এইসব ঘটনা চলতেই থাকবে। কিন্তু আমি বলবো, এই উদাসীনতা আমাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এই যে ৬১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, এসবের পেছনে কেবলই কি ঘৃণা ছিল? নাকি এর সাথে ছিল রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত, ধর্মীয় কুসংস্কার, সমাজের বিভাজন এবং ক্ষমতার লোভ? খুনের শিকার যারা হয়েছে, তারা হয়ত কোনোদিন জানতেও পারবে না কেন তাদের জীবনের এমন করুণ পরিণতি ঘটলো। কিন্তু আমাদের কি উচিত না এই প্রশ্নটি তোলার এবং একটি পরিবর্তনের জন্য কাজ করার?
আমাদের সমাজের সবচেয়ে কমজোরি অংশের উপর এতো বড় আঘাত আসা মানে, আমাদের মানবিকতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আমরা কি সত্যিই মানবিক সমাজে বাস করছি, নাকি শুধুই একটা মুখোশে আড়ালে নিজের স্বার্থ রক্ষা করছি? এই দেশে যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের সুরক্ষা অনুভব না করে, তবে আমরা কিভাবে নিজেদেরকে একটি স্বাধীন ও সমৃদ্ধ সমাজ বলতে পারি?
এখন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের কি করা উচিত। প্রথমেই আমাদের নিজেদের মধ্যে সচেতনতা জাগাতে হবে এবং বুঝতে হবে যে সংখ্যালঘুদের উপর আঘাত মানে আমাদের সামগ্রিক সমাজের উপর আঘাত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে এই বিষয়ে তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। সম্প্রীতির সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে সেই দীক্ষা দিতে হবে।
এছাড়া, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও একটি শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে। আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অবিলম্বে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। যে কোনো ধরনের বৈষম্য এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করতে হবে।
আজকের দিনে এসে এমন অনেকেই আছেন যারা সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছেন। আমাদের উচিত সেগুলিকে সমর্থন করা এবং এমন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যেখানে সংখ্যালঘুরা নিজেদের কথা বলতে পারবে, তাদের দুঃখ-কষ্টগুলো শেয়ার করতে পারবে। একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে তারা যদি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে, তাহলে এই অবিচার বন্ধ হতে পারে।
অবশেষে, আমাদের নিজেদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি নিজেদের প্রিয় দেশটিকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসি, তাহলে আমাদের উচিত এইসব ঘটনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। সমাজের প্রতিটি স্তরে সংখ্যালঘুদের প্রতি সহিষ্ণুতা এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একদিন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের দিকে তাকিয়ে বলবে, “আমাদের পূর্বজরা সাহস দেখিয়েছিল এবং আমরা এখন একটি সুখী এবং সমৃদ্ধ দেশে বাস করি।”
আপনি কি মনে করেন, আজকের বাংলাদেশ কি সত্যিই সেই স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? নাকি আমরা কেবলই আমাদের অতীতের ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে, নিজেদের সংকীর্ণতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ছি? সময় এসেছে আমাদের জেগে ওঠার এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার, যেখানে প্রত্যেকেই নিজেদের সুরক্ষিত এবং সম্মানিত মনে করবে।
