সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লাগাতার হিংসা চলছেই। এবার যশোরে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। নিহত ব্যক্তি রানা প্রতাপ (৪৫)। তিনি একটি আইস ফ্যাক্টরির মালিক ছিলেন এবং একই সঙ্গে একটি দৈনিক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
স্থানীয় সূত্রের খবর, সোমবার সন্ধ্যা প্রায় ৬টার দিকে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কোপালিয়া বাজার এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কয়েকজন যুবক মোটরসাইকেলে করে এসে রানা প্রতাপকে তার আইস ফ্যাক্টরি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে একটি গলিতে নিয়ে গিয়ে তাকে মাথায় গুলি করে এবং গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রিপন হোসেন জানান, হামলাকারীরা প্রথমে রানা প্রতাপের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। এরপর পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে সাতটি গুলির খোল উদ্ধার করা হয়েছে।
মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাজিউল্লাহ খান বলেন, “রানা প্রতাপের মাথায় তিনটি গুলি করা হয়েছে এবং তার গলা কাটা ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতার ফারুক মিন্টু জানান, রানা প্রতাপ পাশের কেশবপুর উপজেলার আরুয়া গ্রামের এক স্কুলশিক্ষকের ছেলে। তিনি গত দুই বছর ধরে কোপালিয়া বাজারে একটি আইস ফ্যাক্টরি পরিচালনা করছিলেন।
তবে স্থানীয় কিছু সূত্র দাবি করেছে, রানা প্রতাপের বিরুদ্ধে যশোর জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা ছিল এবং তিনি একটি চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি নড়াইল জেলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিডি খবর পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকও ছিলেন।
ত্রিকাটির নিউজ এডিটর আবুল কাশেম বলেন, “রানা প্রতাপ আমাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। একসময় তার বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও সেগুলোতে তিনি খালাস পেয়েছিলেন। কী কারণে তাকে হত্যা করা হলো, তা আমরা জানি না।”
এদিকে কেশবপুর উপজেলার সুফলাকাটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করে বলেন, “রানা প্রতাপ একটি চরমপন্থী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কোপালিয়া এলাকায় তার নানা বিরোধ ছিল। তিনি নিজের গ্রামে থাকতেন না, ওই এলাকাতেই চলাফেরা করতেন।”
ধারাবাহিক সহিংসতা
এই হত্যাকাণ্ডের আগেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে একাধিক সহিংস ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার ঝিনাইদহ জেলায় এক হিন্দু বিধবাকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্তরা তার কাছ থেকে টাকা দাবি করে, চিৎকার করলে তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে চুল কেটে নেয়, ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। পরে তিনি অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন।
এর কয়েক দিন আগে, ৩১ ডিসেম্বর খোকন চন্দ্র দাসকে একদল লোক মারধর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বাঁচলেও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার আগেও অমৃত মণ্ডল এবং দীপু চন্দ্র দাস নামে আরও দুই হিন্দু ব্যক্তির হত্যার ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার এই ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভারত সরকার বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে “অবিরাম শত্রুতা” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখার কথা জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার দাবি করেছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
