বাংলাদেশ আমাদের স্বপ্নের দেশ। বাঙালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ও চিরন্তন সম্প্রীতি বজায় রেখে আমরা যুগ যুগ ধরে একসাথে বসবাস করে আসছি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আমার মনে হচ্ছে আমাদের মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরী হচ্ছে, যা দূরত্ব বাড়াচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর। হয়তো আপনি আমার সাথে একমত হবেন না, কিন্তু বাস্তবতা ঐক্য আর সম্প্রীতির ছবিকে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলছে। মন্দিরের সামনে বাধা, স্কুলে ধর্মনিয়ে গালিগালাজ এটা হয়তো ছোট ছোট ঘটনা মনে হতে পারে, কিন্তু এদের প্রভাব বিশাল।
আমার মনে আছে, যখন আমি ছোট ছিলাম, আমাদের পাড়ার মন্দিরে পুজো নিয়ে কত আনন্দ হতো। মুসলিম, হিন্দু সবাই মিলে পুজো দেখতে যেতাম। কোলাহলে ভরা সেই সময়গুলো আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। আশেপাশের বাসিন্দারা একে অপরের বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি বিতরণ করত। কিন্তু আজকাল খবরের কাগজ খুললে দেখি বিভিন্ন জায়গায় মন্দিরের সামনে বাধা, পূজার সময় বিক্ষোভ। এ কি আমাদের সেই চিরচেনা বাংলাদেশ! এক মুসলমান হিসেবে আমার মনে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে, কেননা সম্প্রীতির এই ভাবটা যেন কেমন ফিকে হয়ে আসছে।
আমাদের দেশের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীরা ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ নেয়। কিন্তু যখন দেখি শিক্ষার্থীরা ধর্ম নিয়ে একে অপরকে কটাক্ষ করছে বা গালিগালাজ করছে, তখন মনে হয় আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি। স্কুলের বইপত্রে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নিয়ে অনেক কিছু লেখা থাকলেও, বাস্তবে তার প্রতিফলন কোথায়? শিক্ষার্থীরা ছোট থেকেই যদি এই ধরনের মানসিকতা নিয়ে বড় হয়, তাহলে সমাজের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে আপনি ভেবেছেন?
আমরা যদি পেছনে ফিরে তাকাই, তবে দেখব বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিলো বিভেদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। পাকিস্তানি শাসকদের ধর্মের ভিত্তিতে নিপীড়ন, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই ছিলো। সেই লড়াইয়ের ফলেই আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা। কিন্তু আজ কেন আমরা নিজেরা নিজেকে বিভক্ত করছি? ছোট ছোট ঘটনা যেগুলো দৈনন্দিন জীবনে ঘটে চলেছে, তা সময়ের সাথে সাথে বড় আকার ধারণ করছে। একদিকে মন্দিরের সামনে বাধা, অন্যদিকে স্কুলে ধর্মীয় গালিগালাজ এগুলোই কি আজকের বাংলাদেশের চিত্র?
একজন ব্লগার হিসেবে আমি মনে করি আমাদেরকে এখনই সচেতন হতে হবে। আমাদের সময়ের ছোট্ট ছোট্ট ঘটনা যেন ভবিষ্যতের বড় বিপদের পূর্বাভাস না হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মনিরপেক্ষতার শিক্ষা যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মনে গাঁথা হয়। কিন্তু কিভাবে? আপনি ভাবতে পারেন, আমি নিজের চিন্তাভাবনা শেয়ার করছি, কিন্তু এর সমাধান কী? আমি মনে করি, সমাধান খুবই সহজ। আমাদেরকে নিজেদের মধ্যকার শত্রুতার দেয়ালগুলোকে ভাঙতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে সচেতন হতে হবে। ছোটদেরকে শিখাতে হবে, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।
মনে আছে একবার একটি হিন্দু পাড়ায় গিয়ে দেখেছিলাম, পূজা শুরু হতে মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি। মন্দিরের সামনে হঠাৎ করে কিছু সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এসে বাধা দিতে শুরু করলো। তাদের দাবি ছিলো, সেখানে পূজা আয়োজন ঠিক নয়। কিন্তু আশেপাশের মুসলিম বাসিন্দারা এসে সেই বাধা প্রতিহত করে পূজার আয়োজন সম্পন্ন করতে সাহায্য করলো। সেই সময় আমার মনে হয়েছিলো, এটাই প্রকৃত বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ মানুষের জন্য পাশে দাঁড়ায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরেপেক্ষতার শিক্ষা দিতে হবে আরো ব্যাপকভাবে। শিক্ষকরা শুধু বইয়ের পাতা পড়িয়ে দিলে হবে না, সেটা বাস্তবে ছাত্রীদের মনে ঢুকাতে হবে। সেই সাথে বাবা-মায়েদেরও তাদের সন্তানদের ধর্মীয় সহনশীলতার পাঠ শেখাতে হবে। ধর্ম যার যার, উৎসব কিন্তু সবার এই বোধ আমাদের নতুন প্রজন্মের মনে গাঁথতে হবে।
আমাদের সমাজে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দায়বদ্ধতা। শিক্ষক, অভিভাবক, নেতা সবাইকেই এই দায়বদ্ধতা নিতে হবে। ছোট ছোট ঘটনা যেন বড় বিপর্যয়ে পরিণত না হয় সেই দিকে নজর রাখতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মন থেকে ভীতি দূর করতে হবে। তাহলে হয়তো আমরা সত্যিকার অর্থে সেই অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতে পারব যা আমাদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করছে।
আর আপনাদের কী মতামত? আপনারা কী মনে করছেন এই ছোট ছোট ঘটনা যেগুলো প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে, তারা আসলে কতটা প্রভাব ফেলছে আমাদের সমাজে? আপনার মতামত জানালে খুব ভালো লাগবে। কারণ, আমরা সকলেই এই দেশের নাগরিক এবং আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদের হাতেই।
