ডিসেম্বরের শীতল বাতাস যখন বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে বয়ে যায়, তখন চারপাশের প্রকৃতি যেন একটা নতুন রূপ নেয়। এই সময়টা আমাদের উৎসবের মৌসুম, নতুন ফসলের ঘ্রাণ আর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। কিন্তু এই আড়ম্বরপূর্ণ দৃশ্যের আড়ালে যে অদৃশ্য অস্থিরতা লুকিয়ে থাকে, তা হয়তো আমাদের দৈনন্দিন কোলাহলেই চাপা পড়ে যায়। আজ আমি সেই অস্থিরতার ডায়েরির পাতা খুলে বসেছি; যে ডায়েরি সংখ্যালঘুদের মনোজগতের কথা বলে।

আমরা যারা এই দেশে মুক্তভাবে শ্বাস নিই, তাদের মনে হয় দেশটা ঠিক আমাদের। কিন্তু এই দেশের একাংশ মানুষের জন্য দেশটা যেন কখনোই পুরোপুরি ‘আমাদের’ হয়ে উঠতে পারেনি। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন এলাকার হিন্দু বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে দুর্গাপূজার আলোকসজ্জা দেখে মুগ্ধ হতাম। একবার আমার এক বন্ধু বলেছিল, তোমাদের ঈদ যেমন আমাদের দেয়া আনন্দের সময়, আমাদের পূজাও তোমাদের দেয়া আনন্দের।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বুঝতে পেরেছি যে এই আনন্দময় সময়গুলো মাঝে মাঝে কতটা তিক্ত হতে পারে। নির্বাচনের সময় বা কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে, সেই বন্ধুদের চোখে আমি দুঃখ আর অনিশ্চয়তা দেখেছি। তাদের বাড়িতে কড়া নিরাপত্তা দরকার হয়, তারা হঠাৎ করে অসুরক্ষিত বোধ করেন। সেই দিনগুলোতে আমি বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি এই দেশ কি সত্যিই তাদের?

দলীয় পরিচয়ের বাইরে এই দেশে যেন এক বিচ্ছিন্নতা রয়ে গেছে। আমাদের সমাজে সংখ্যালঘুদের নিয়ে কিছু অলিখিত নিয়ম আছে, যা তাদের অনেক সময় এক প্রকারের অদৃশ্য কারাগারে বন্দি করে রাখে। তারা নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে খোলাখুলি আনন্দ করতে পারেন না। আমি নিজেও দেখেছি, কোলকাতায় পূজার সময় মানসিক অবস্থা কেমন হয়! সেখানে পূজা শুধু ধর্মীয় উদযাপন নয়, বরং একটা সামাজিক মিলনের অনুষ্ঠান। অথচ আমাদের দেশে সেটা কখনো কখনো হয়ে যায় আতঙ্কের উৎস।

আমার জানামতে, একটি সাম্প্রদায়িক সমাজে বাস করাটা মানসিকভাবে কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে তা বোঝা সত্যিই কঠিন। আমার এক সহপাঠী তার পরিবারের সাথে বছরের পর বছর ধরে নিজেদের জমিজমা নিয়ে কোর্টে লড়াই করছে। শুধুমাত্র সংখ্যালঘু হওয়ার অপরাধে তার জমির অধিকার নিয়ে বারবার জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এটা কেমন বিচার? যে দেশের মাটিতে জন্মেছি, সেই মাটিতেই কি আমার অধিকার নেই?

সংখ্যালঘুদের মনোজগতে এমন অনেক অঙ্গিকার লুকিয়ে থাকে, যা তারা কখনো কোনোদিন প্রকাশ করতে পারেন না। আমাদের উচিত, তাদেরও সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। আমরা যদি সত্যিই এই দেশকে আমাদের বলে ভাবতে চাই, তবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন সবার জন্য সমান অধিকার এবং নিরাপত্তা থাকে।

অনেকেই বলবেন, সংখ্যালঘুদের সমস্যা তো শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই আছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমরা যদি সত্যিই গর্বিত হতে চাই আমাদের দেশের উপর, তবে আমাদের এই পার্থক্যগুলো মিটিয়ে ফেলতে হবে। শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে দেশকে মাপা যায় না, দেশের সত্যিকারের পরিচয় হলো তার মানুষের মনোজগত। আর সেই মনোজগতে যদি ভেদাভেদ রয়ে যায়, তাহলে সেটা কি সত্যিকারভাবে আমাদের দেশ হবে?

আমরা যদি নিজেদের দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য একটা নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তবে সেটাই হবে আমাদের জন্য একটা বড় বিজয়। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রগতিশীল সমাজের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো এই বিভাজনগুলো দূর করা। আমাদের উচিত নিজেদের মধ্যে সংযোগ বাড়িয়ে তোলা, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতার বন্ধন তৈরি করা।

এই লেখা যখন আমি শেষ করছি, তখন আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আমাদের দেশ কি সত্যিই সবার? আমরা কি আদৌ সেই বিবিধতার সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পেরেছি যা প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ করে? যদি আজ থেকে আমরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হই, তাহলে কেমন করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বলবো এ দেশ তাদের?

এই প্রশ্নগুলো হয়তো আজকের নিরব দুপুরে উত্তর পাবে না, কিন্তু আমি আশা করি, একদিন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই বাঁধনগুলোকে ছিন্ন করতে পারবে এবং একটা সত্যিকারের একতাবদ্ধ জাতি গঠন করতে পারবে। এই ডিসেম্বরের শীতল বাতাসে, আসুন আমরা এই পরিবর্তনের অঙ্গীকার করি।

By amitav