প্রত্যেকবার যখনই কোনো গুজব ছড়ায়, তা যেন সমাজের উপর একটা অদৃশ্য ছুরি চালায়। মাইক থেকে কথাটি আসুক বা সামাজিক মাধ্যমের অদৃশ্য দেওয়ালে লেখা হোক, গুজবের প্রভাব হতে পারে মারাত্মক। আর যদি এর শিকার হয় কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, তখন সেই সম্প্রদায়ের উপর যে আঘাত আসে তা হয় বহুপ্রাচীন কুৎসিত বিভেদ ও বিদ্বেষের পুনরাবৃত্তি। আজ আমি আপনাদের সাথে এই বিষয়েই আলোচনা করবো, বাংলাদেশে হিন্দু–খ্রিস্টানদের উপর হামলার পেছনে গুজবের ভূমিকা এবং এর ভয়াবহতা।
আপনি হয়তো জানেন, আমাদের দেশে গুজব খুব দ্রুত ছড়ায়। আমাদের সমাজের একাংশের মধ্যে আজও সেই অন্ধবিশ্বাস কাজ করে, যা সবসময় নতুন কিছু শোনার জন্য উদগ্রীব। আর এই সুযোগটাই ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যারা তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। গুজব ছড়ায়, এবং তার পরিণতি হয় ভয়ানক। আমরা দেখেছি কীভাবে গুজবের ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নিরীহ মানুষ তাদের জীবন হারায় বা হারায় তাদের সম্পদ।
গুজবের পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। কখনো রাজনৈতিক লাভ, কখনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা শুধু মজা করার জন্যও এটি ছড়ানো হয়। কিন্তু যে কারণই হোক, এর পরিণতি সবসময়ই ভয়াবহ। এমন নয় যে গুজব ছড়ানোর ঘটনা নতুন কিছু। ইতিহাসে গুজবের কারণে অনেক বড় বড় যুদ্ধ, দাঙ্গা এবং বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির প্রসার এবং সামাজিক মাধ্যমের আগমনে এই গুজব ছড়ানো যেন আরও সহজ হয়ে গেছে।
আমার মনে আছে, কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের এক গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে একটি নির্দিষ্ট হিন্দু পরিবার মন্দিরের মাইক থেকে বলে দিয়েছে তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো গ্রাম উত্তাল হয়ে উঠেছিল। লোকজন সেই পরিবারের বাড়িতে হামলা চালায়, তাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়, এমনকি তাদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করে। পরে তদন্তে জানা যায়, এটি সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। এই ঘটনা শুধু একটা উদাহরণ, এমন আরো অনেক ঘটনা আছে যা হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে বা আমরা গুরুত্ব দিইনি।
গুজবের ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলতে গেলে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, তা হলো আমাদের শিক্ষার অভাব। আমাদের সমাজে শিক্ষার অভাবের কারণে মানুষ গুজবে খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়। তারা যাচাই-বাছাই না করেই বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসের কারণেই সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং দুর্ভোগের শিকার হয় নিরীহ মানুষ। তাই শিক্ষার প্রসার গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ গুজবের সত্য-মিথ্যা বিচার করতে পারে এবং সচেতন হতে পারে।
গুজব ছড়ানোর আরেকটি শক্তিশালী মাধ্যম হলো সামাজিক মাধ্যম। ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি মাধ্যমে খুব সহজেই যে কেউ গুজব ছড়াতে পারে। একবার যদি কোনো তথ্য বা খবর ভাইরাল হয়ে যায়, তাহলে তা সত্য হোক বা মিথ্যা, বহু মানুষ ততক্ষণে তা বিশ্বাস করে নেয়। এই বিষয়ে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায়িত্ব আছে। তাদের উচিত গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে, আমাদের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রচুর উদাহরণ আছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে এই সম্প্রীতি কখনো কখনো ভেঙে পড়ে। গুজব সেই ভাঙনের অন্যতম কারণ। আমাদের উচিত এই গুজবের বিরুদ্ধে সরব হওয়া, যে কোনো খবর বা তথ্য যাচাই করা এবং সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বশীলভাবে আচরণ করা।
সর্বশেষে, গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়, এটা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। আমরা যদি সচেতন হয়ে প্রতিটি গুজবের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, যদি আমাদের সমাজে সচেতনতা বাড়াই এবং সবাই মিলে সম্প্রীতির জন্য কাজ করি, তবে এই ধরনের ভয়ানক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারি। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কি এ নিয়ে সচেতন হওয়ার জন্য প্রস্তুত? আপনি কি আপনার চারপাশের মানুষকে সচেতন করতে চান? আপনি কি গুজবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান? সিদ্ধান্ত এখন আপনার।
