আজকের দুনিয়ায় ফেসবুক লাইভ আর টিকটক ভিডিওর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সবাই চোখের সামনে দেখি কিভাবে মানুষ এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে নিজেদের প্রকাশ করছে। কিন্তু কখনো কখনো এই প্রকাশের রাস্তা বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে একটি নিরীহ ভিডিও বা লাইভ স্ট্রিমই হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুদণ্ডের কারণ। বাঙালিরা তো বলেই, “মানুষের চেয়ে কিছুই বড় নয়।” তবে কি এই কথাটা এখন মিথ্যে হতে চলেছে?
আপনি মনে করতে পারেন, কিভাবে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে রোমিও জুলিয়েট প্রেম কাহিনী জিয়া চৌধুরীর ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে এক ভয়াবহ ট্রাজেডির দিকে মোড় নেয়। একদল ভিড় তার কথায় কথায় কান দেয়নি, বরং সরাসরি তার মেরে ফেলার পক্ষে যায়। একটা মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেলো কয়েক মিনিটের ফেসবুক লাইভে। এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা এখন আর একা নই। আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ, প্রতিটা কথা, প্রতিটা ক্ষণব্যবধান সবই যেন জনতার আদালতে বিচারাধীন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো আজকের দিনে এতটাই প্রভাবশালী যে এদের ভুল ব্যবহারের ফলে ঘটতে পারে ভয়ানক কিছু। আপনি টিকটকের উদাহরণ নিন। প্রতিদিন কতো মানুষ নিজেদের সৃজনশীলতা প্রদর্শন করতে মেতে থাকেন টিকটকে। কিন্তু কখনো কখনো এই ভিডিওগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ইচ্ছাকৃতভাবে চিন্তাজগতের গভীরতায় ঢুকে যায় এবং সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আর ইন্টারনেটে একবার কিছু ভাইরাল হয়ে গেলে, তার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা সহজ ব্যাপার নয়।
বাংলাদেশে ডিজিটাল মবের হাতের কয়েকটি উদাহরণ আমাদের চোখ খুলে দেয়। মনে পড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মামলাটির কথা, যেখানে একজন ছাত্রের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা অভিযোগ তোলার পর লোকজন তাকে মারধর করে ফেলে। এই ঘটনা ফেসবুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একপাল মানুষ অন্যের জীবনকে নরক বানিয়ে ফেলে শুধুমাত্র একটি মিথ্যে অভিযোগের ভিত্তিতে। এটা কি উন্নত জীবনের লক্ষণ নাকি বর্বরতার পুনর্জাগরণ?
এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে: আমরা কি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করছি, নাকি তারা আমাদের ব্যবহার করছে? যখনই কোনো ঘটনা ঘটে, আমরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাই, কখনো কখনো বিবেচনা না করেই। এই প্রক্রিয়ায় আমরা ভুলে যাই যে আমাদের প্রতিত্ত্বের পেছনে অন্য কারো জীবন জড়িত থাকতে পারে। আমরা কি আসলেই জানি যে আমাদের এক ক্লিক কতটা বিপদজনক হতে পারে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়গুলো আরও বেশি গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ, এবং এই আবেগপ্রবণতা অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সহজলভ্যতা এ ব্যাপারটিকে আরও বেশি বিপদজনক করে তুলেছে। কারণ আমরা বুঝতে পারিনা যে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ভুল ব্যবহারের ফলে আমরা নিজেই একদিন তার শিকার হতে পারি। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, মানুষের চেতনা এবং সচেতনতার প্রয়োজন আরও বেশি। আমাদের উচিত হবে এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করার আগে এর প্রভাব সম্পর্কে ভালোভাবে জানা এবং বুঝে ব্যবহার করা। আমাদের নিজেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে আমরা ডিজিটাল মবের হাত থেকে নিজেদের এবং অন্যদের রক্ষা করতে পারি।
এখন ভাবনার বিষয় হলো: আমরা কি নিজেদের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল স্পেস তৈরি করতে পারবো, যেখানে আমরা স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবো, কিন্তু অন্যের ক্ষতি করার চিন্তা না করেই? আমাদের কি উচিত হবে এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে একটি কিছু নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা, যেখানে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে তারপরই জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়?
অথবা আমাদের কি একান্তই উচিত ডিজিটাল উদ্দেশ্য পূরণ করার চেষ্টার পরিবর্তে মানুষের জীবন ও সুরক্ষা নিয়ে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে। হয়তো এই উত্তরেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ।
