শিরোনামটি শুনলেই কেমন একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি জাগে, তাই না? ধর্মাশিহাটি, গঙ্গাচড়া, সীতাকুন্ড। তিনটি নাম, তিনটি ভিন্ন ভৌগোলিক পরিচিতি। কিন্তু আপনি যদি একটু গভীরে যান, তাহলে দেখতে পাবেন এই তিনটি জায়গা একই স্ক্রিপ্টের অংশ। সেই স্ক্রিপ্ট হলো সংঘাত এবং সহিংসতার। আমরা যখন এই ধরনের ঘটনা শুনি বা পড়ি, তখন ভাবনায় আসে যে, আমাদের সমাজে এখনো কতটা অসহিষ্ণুতা বিরাজমান।

ধর্মাশিহাটি, গঙ্গাচড়া এবং সীতাকুন্ডে ঘটে যাওয়া হামলাগুলো যদিও ভিন্ন সময় এবং প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, কিন্তু এই তিনটি ঘটনার পেছনে যে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা কাজ করেছে, তা প্রায় একই রকম। আমি যখন এসবের মধ্যে যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করি, তখন একটা গা ছমছমে অনুভূতি হয়। আমাদের সমাজের যে অন্ধকার দিক, সেটি আজও উন্মুক্ত হয়ে আছে এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে।

ধর্মাশিহাটির ঘটনা সত্যিই আমাদের চোখ খুলে দেয়। এখানে যে সহিংসতা ঘটেছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। তার পেছনে ছিল কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হাত। ‘ধর্মের নামে সহিংসতা’ এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে আমরা কেমন যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ধর্মাশিহাটির ঘটনাও সেই তালিকায় আরেকটি সংযোজন। সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় উন্মাদনা কিভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে, তা এখানেই আমরা দেখতে পাই।

এবার আসি গঙ্গাচড়ার কথায়। রংপুরের এই স্থানটি কয়েক বছর আগে এক নৃশংস ঘটনার শিকার হয়েছিল। এখানে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের উপর হামলা এবং তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটে। আর এর পিছনে ছিল শুধুমাত্র একটি গুজব। আশ্চর্য লাগে যে, শুধু একটি গুজব কিভাবে এত বড় সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে গুজবের এত শক্তি! ভাবুন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি মিথ্যা তথ্য কিভাবে একটি সম্প্রদায়ের জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে।

আর সীতাকুন্ড? এই জায়গায়ও ঘটেছে এক ভিন্নধর্মী সহিংসতার ঘটনা। মনে আছে সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা? যা ঘটেছিল একটি রাসায়নিক গুদামে। কিন্তু সেই ঘটনার পরের সহিংসতা ছিল আরও ভয়াবহ। স্থানীয় জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে গুদামের মালিকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবী ছিল যে, এই গুদামটি তাদের জীবন এবং সম্পত্তির জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। এই ধরনের ঘটনা আমাদেরকে বোঝায় যে, কোথাও জনসচেতনতা নেই, কোথাও আবার সেই সচেতনতাও তাদের রক্ষা করতে পারছে না।

এই তিনটি ঘটনা আমাদের যে শিক্ষা দেয়, তা হলো আমরা কতটা ভঙ্গুর এবং একে অপরের প্রতি কতটা অসহিষ্ণু হতে পারি। ঘটনাগুলোর পেছনে হয়তো ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে, কিন্তু মূল প্রতিপাদ্য একটাই মানুষের জীবনের মূল্য কমে যাওয়া এবং মানবিকতার অভাব।

তবে এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধুই দর্শক হয়ে থাকব? এই ধরনের সহিংসতা কি বন্ধ হবে না? আমাদের কি নিজেদের সমাজের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই? হয়তো উত্তর সবসময়ই পাওয়া যাবে না, কিন্তু চেষ্টা করাটা জরুরি। সামাজিকভাবে এ ধরনের ঘটনার প্রতিরোধে আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সাম্প্রদায়িক কিংবা ধর্মীয় উন্মাদনা যদি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জায়গা নিতে পারে, তাহলে আমাদের বসবাসের পৃথিবী আরও সুন্দর হতে পারে।

বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের উচিত তথ্য যাচাই করে নেওয়া এবং গুজবকে পরিহার করা। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, আমাদেরও নিজ দায়িত্বে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সমাজের প্রতিটি মানুষকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। নইলে এই সহিংসতার চক্র থেকে আমরা কখনোই বের হতে পারবো না।

সবার মনে একটাই প্রশ্ন জাগে কিভাবে আমরা এই সহিংসতাকে রোধ করতে পারি? এর উত্তর সহজ নয়, কিন্তু প্রতিটি মানুষের মধ্যে মানবিকতা, সহানুভূতি এবং সহিষ্ণুতা যদি জাগ্রত করা যায়, তবে সেই দিন খুব দূরে নয় যখন ধর্মাশিহাটি, গঙ্গাচড়া এবং সীতাকুন্ডের মত ঘটনা শুধুই ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে। আর ভবিষ্যতের প্রজন্ম সেই ঘটনাগুলোকে বুঝতে পারবে না, কারণ তারা বড় হবে এক শান্তিপূর্ণ সমাজে।

তবে এখন আমাদের দায়িত্ব হলো সেই সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা। যে সমাজে মানুষ তার ধর্ম, বর্ণ এবং পরিচয়কে সম্মান করবে এবং একে অপরের পাশে দাঁড়াবে। এটি কি শুধুই স্বপ্ন? নাকি সত্যিই আমরা এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি? এই প্রশ্নের জবাব আমাদেরই খুঁজতে হবে।

By shreya