২০২৫–এর শেষেসংখ্যালঘু কিশোর–কিশোরীদের স্বপ্ন: ‘এদেশেই কি ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব?’

খুবই সাধারণ কথার মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তি আছে। এটা এমন কিছু যা আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে গভীরে প্রোথিত থাকে। আমাদের স্বপ্নগুলো বিশেষ করে কিশোর ও কিশোরীদের স্বপ্ন। তাদের ভবিষ্যৎ কল্পনা, তাদের আশার আলো এবং তাদের অনিশ্চয়তা। আজ, আমরা সেই বিশেষ সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি যখন বাংলাদেশের সংখ্যালঘু কিশোর-কিশোরীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবছে। তাদের সামনে প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে, ‘এদেশেই কি ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব?’

আমার মনে আছে, একদিন এক ছোট্ট মেয়ে আমার পাশে বসে ছিলো। তার নাম ছিলো সুপ্তি। তার চোখগুলো ছিলো উজ্জ্বল এবং ভরপুর কৌতূহল নিয়ে। আমায় জিজ্ঞেস করেছিলো, “আচ্ছা ভাইয়া, আমরা কেন এত ভয় পাই?” সুপ্তির কথায় অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। তার মধ্যে আশঙ্কা, তার মধ্যে অজানা কিছু পাওয়ার ইচ্ছে এবং এখনও আমাদের সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। গভীরভাবে ভাবলে বুঝতে পারা যায়, এই প্রশ্নটা শুধু সুপ্তির একার নয়; অন্যান্য অনেক কিশোর-কিশোরীর মুখেও এই প্রশ্ন ওঠে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগের প্রসারতা আমরা দেখে আসছি। ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে এসে যখন আমরা পেছনে তাকাই, দেখতে পাই কীভাবে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করে গেছে। এখন, যেকোনো একটি গ্রামের কিশোর-কিশোরীও ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়ে বিশ্বের খবর জানতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে, এমনকি ফ্রিল্যান্সিং করেও অর্থ উপার্জন করতে পারে। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিং আয়ের দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, এবং এদেশের তরুণরা এর মাধ্যমে নিজেদের জীবনের একটি নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে।

তবুও, সংখ্যালঘু কিশোর-কিশোরীদের জন্য এই উন্নয়নের সুবিধা প্রসারিত করা এখনও অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জিং। সমাজের বিভিন্ন স্তরের বৈষম্য এবং কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অমানবিক আচরণের কারণে এই কিশোর-কিশোরীরা তাদের সামনে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্যের যে প্রাচীর রয়েছে, তা ভেঙে ফেলা সহজ কাজ নয়।

তবুও আশা করি আমরা সেই দিন আসবে যখন সুপ্তিদের মত প্রতিটি কিশোর-কিশোরী তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারবে। তারা এদেশেই তাদের স্বপ্ন গড়তে পারবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনীতি এবং সমাজের নেতাদের সমর্থন এবং দায়িত্বশীল আচরণ। এছাড়া শিক্ষার মান ক্রমাগত উন্নত করে যেতে হবে। প্রতিটি মফস্বল এলাকায় উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা এবং শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপরও জোর দিতে হবে।

আমার মনে হয়, আজকের যুগে একটি মেয়ে বা ছেলে শুধু সফল হতে চায় না, তারা চায় আত্মনির্ভরশীল হতে। এই আত্মনির্ভরশীলতার জন্য প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, সামাজিক সহায়তা এবং একটা নিরাপদ পরিবেশ যেখানে তারা নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে।

তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কী ধরনের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই? আমরা কি এমন একটা দেশ গড়তে চাই যেখানে কিশোর-কিশোরীরা তাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য দেশান্তরী হবে, নাকি আমরা এমন একটা উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে তারা তাদের স্বপ্ন এখানে থেকেই পূরণ করতে পারবে?

তবে, আমি আশাবাদী। কারণ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে উদ্যম, যে প্রচেষ্টা এবং যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আমি দেখেছি, তাতে আমি বিশ্বাস করি যে, আমাদের সামনে অন্য এক বাংলাদেশ রয়েছে। যে বাংলাদেশে প্রতিটি কিশোর-কিশোরী, যেমন সুপ্তি, তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে। তারা আর ভয় পাবে না, বরং আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যাবে তাদের স্বপ্নের পথে।

তো, আসুন আমরা সবাই মিলে কাজ করি। যেন এই কিশোর-কিশোরীরা একদিন বলতে পারে, ‘হ্যাঁ, এদেশেই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব। এখানে আমরা আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারি।’ আমাদের কাজ শুরু হোক এখান থেকেই, যাতে তারা কখনো আর এই প্রশ্নটি করতে না হয়।

By laboni